কদিন পরই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগের মহিমায় সারা দেশে উদযাপিত হবে ঈদ। এ উপলক্ষে রাজধানী ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। যাত্রাপথে বাড়তি ভাড়ার সাথে বৃষ্টি-জলবদ্ধতায় নাকাল যাত্রীরা। উপচে পড়া ভিড় সদরঘাট, রেলস্টেশন এবং বাস টার্মিনালগুলোতে। একইসাথে বিপজ্জনক দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সড়কের ৩৮ বাঁক, ত্রুটিপূর্ণ সড়কের সঙ্গে বাড়তি ঝুঁকি যোগ করছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চালকদের প্রতিযোগী মনোভাব এবং নিয়ন্ত্রহীন অটো-ইজিবাইক-ভটভটির বেসামাল চলাচল। ফলে যাত্রীরা বলছেন মানসিক চাপ আর শঙ্কা নিয়েই ঘরে ফিরছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে সুস্থভাবে বাড়ি ফেরাই যেন বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে ঈদের মাত্র দুই দিন আগে টাঙ্গাইলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে যাত্রীদের মাঝে। কালিহাতী উপজেলায় ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহতের ঘটনাকে চালকের ‘ভুল’ ও যাত্রীদের ‘সচেতনতার অভাব’ বলছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার পর প্রথম পর্যায়ে তার মনে হয়েছে, এটা চালকের ভুলের কারণে হয়েছে’। যদিও সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ। মন্ত্রী বলেন, ‘রডবোঝাই ট্রাকে যদি এভাবে যাত্রীরা উঠে যান, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে’। এ ঘটনা সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে খুব একটা যুক্ত ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ঈদযাত্রায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ট্রেন চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে রেল যোগাযোগ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘পরিবহন মালিক, শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে’। ফিটনেসবিহীন যানবাহন কোনোভাবেই সড়কে নামানো যাবে না এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
সরেজমিনে গতকাল সদরঘাট, গুলিস্তান, মহাখালী, সায়েদাবাদ এবং কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, সবখানেই যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর কোরবানির ঈদে ঢাকা থেকে প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ গ্রামের বাড়ি বা অন্যান্য জেলায় ঈদ করতে যাত্রা করেন। ঈদের ছুটির দিনগুলোতে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া এবং ঢাকায় প্রবেশ করা মানুষের সংখ্যার ভিত্তিতে ঢাকা শহরের জনসংখ্যার স্বাভাবিক ভারসাম্যও পরিবর্তিত হয়।
ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্নে করতে বরাবরের মতোই এবারও রেলযাত্রার অগ্রিম টিকিট ১০ দিন আগে থেকেই বিক্রি শুরু হয়। যদিও যাত্রীরা বলছেন আগের মতোই অনলাইনে কোনো টিকিট পাওয়া যায় না। সরাসরি এসেও টিকিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। রাজধানীর সদরঘাটে দেখা যায়, বিভিন্ন রুটের লঞ্চগুলো ছাড়ছে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে। তবে ট্রলার থেকে লঞ্চে উঠার দুর্ঘটনার কথা মাথায় থাকায় এবার তেমন দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে রাজধানীর মতিঝিল, কল্যাণপুর, গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন বাসস্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব স্টেশনেই আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। ঢাকা থেকে যশোরের ৫০০ টাকা রেগুলার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৮০০ টাকা। একই চিত্র প্রায় সব রুটেই। একাধিক যাত্রী রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন, সরকার থেকে নির্দেশ দিলেও কাজ হয় না। আমরা মনে করি, এগুলো লোক দেখানো। না হয় তারা সরকারের চেয়ে শক্তিশালী।
সড়কপথে মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে গত ২৫ মে থেকে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তবে রাজধানীর ভেতর ‘চাইনিজ তেলাপোকা’ খ্যাত অটো-ইজিবাইক-ভটভটি যানজটসহ বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনা। একইভাবে জেলা শহরগুলোর ওয়ানওয়ে রাস্তাগুলো এসব ছোট যানের উলটো চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এদিকে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশের পাশে কোনো যানবাহন পার্কিং না করার নির্দেশও দিয়েছে সমিতি। যদিও সে নির্দেশ মানছে না গুলিস্তান, সায়েদাবাদ বা যাত্রাবাড়ীতে পার্ক করা বাসগুলো।
এদিকে ঈদ সামনে রেখে দেশের সাতটি প্রধান মহাসড়কে যানজটপ্রবণ ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এসব এলাকায় ঈদের আগে ও পরে নিবিড় মনিটরিং করা হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে রয়েছে ২৫ ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৮টি, ঢাকা-আরিচায় ৭টি, ঢাকা-ময়মনসিংহে ৭টি এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে একটি স্পট রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে মেঘনা টোলপ্লাজা, যমুনা সেতু টোল এলাকা, কাঞ্চন সেতু, কাঁচপুর, বাইপাইল, নবীনগর ও গাজীপুর চৌরাস্তা।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়ক মেরামত, সংকীর্ণতা, টোলপ্লাজায় অতিরিক্ত চাপ ও বিকল যানবাহনের কারণে যানজট কিছুটা রয়েছে। তবে আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। বরাবরের মতো এবারও বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী পথ তৈরি করা হয়েছে ঢাকা বিমানবন্দর ও জয়দেবপুর রেলস্টেশনে। সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ একাধিক ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার (টিটিই) দায়িত্ব পালন করছেন।’
উল্লেখ্য, শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কারখানার মধ্যে গতকাল ৪২ শতাংশ কারখানায় ঈদের ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি তৈরি পোশাক কারখানা আছে। বাকি ৪৫ শতাংশ কারখানায় মঙ্গলবার ছুটি দেওয়া হবে। অন্য কারখানাগুলো আগেই পর্যায়ক্রমে ছুটি ঘোষণা করেছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কারখানা ছুটি হওয়ায় বিকেল (গতকাল) থেকে শ্রমিকেরা বাড়ি ফেরা শুরু করবে। তখন হয়তো চাপ আরও বাড়বে।’
হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী, ভোগড়া ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়ছে। এসব এলাকায় বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কিছু সময় ধীরগতিতে যান চলাচল করেছে। তবে দীর্ঘ যানজটের খবর সৃষ্টি হয়নি।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মাঠে নেমেছে বিজিবি
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও জনসাধারণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মাঠে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ঈদ পরবর্তী ৩ দিন পর্যন্ত যানজটপ্রবণ এলাকায় এ দায়িত্ব পালন করবেন তারা। গত শুক্রবার বিজিবির সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও জনসাধারণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টোল প্লাজা, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার টোল প্লাজা এবং পদ্মা সেতু টোল প্লাজায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
রেলপথে টিকিট সংকট ও অতিরিক্ত ভিড়
রেলপথে চাপ বাড়ার শঙ্কা দেখা গেছে যাত্রীদের মাঝে। একইসাথে টিকিট না পেয়ে অনেককে ট্রেনের ভেতরে দাঁড়িয়ে ও ছাদে বসে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাড়িতে যেতে দেখা যায়।
নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী
এদিকে গতকাল হঠাৎ ভারি বৃষ্টিতে নৌপথের ঈদযাত্রায় ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। এদিকে বাড়তি যাত্রী নিতে গিয়ে লঞ্চডুবি কিংবা ট্রলার থেকে লঞ্চে উঠতে গিয়ে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে প্রশাসন। যদিও নিয়মকানুনের পাত্তা দিচ্ছে না যাত্রীরা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন