মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রায় ৯ বছর পার হলেও রোহিঙ্গা সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি, উল্টো দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর মধ্যেই একাধিক নতুন বৈশ্বিক সংকট এবং দাতা দেশগুলোর বাজেট কাটছাঁট হওয়ায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সাহায্য ও জীবনযাত্রার মান চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা- ইউএনএইচসিআর এক বিশেষ বিবৃতিতে সতর্ক করে জানিয়েছে, মানবিক তহবিলের ক্রমাগত ঘাটতির ফলে শরণার্থীশিবিরগুলোতে খাদ্য, আশ্রয় এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক পরিষেবাগুলো বজায় রাখা দাতব্য সংস্থাগুলোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠছে।
ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ জানিয়েছেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে এবং সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই শরণার্থীদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে আসছে।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের পর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা একযোগে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। কিন্তু সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, কারণ ২০২৪ সালের প্রথম দিক থেকে মিয়ানমারে নতুন করে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ও সহিংসতার জেরে আরও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
একদিকে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার বাজেট কমিয়ে দিয়েছে।
এই আর্থিক টানাপড়েনের মাঝেই গত মাসে জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে রোহিঙ্গা শিবিরের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ (৭১০.৫ মিলিয়ন) ডলারের একটি জরুরি তহবিল আহ্বান করেছে। উল্লেখ্য, এই বছর বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রাটি গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম ধরা হলেও, এখন পর্যন্ত মাত্র ৬০ শতাংশ তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
ফলে বিশাল এই জনসংখ্যার প্রতিদিনের খাবার ও নিরাপত্তার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই রেশনের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ায় ক্যাম্পের ভেতর তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে; যার ফলে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টের মুখে পড়েছেন।
কক্সবাজার ও টেকনাফের ঘিঞ্জি ও ভঙ্গুর শরণার্থীশিবিরের জীবন বরাবরই অত্যন্ত কষ্টের। তার ওপর প্রায়শই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ধস, মহামারি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। শিবিরে শিক্ষা ও উপার্জনের কোনো বৈধ সুযোগ না থাকায় রোহিঙ্গারা সম্পূর্ণভাবে বিদেশি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।
বছরের পর বছর এই বন্দিজীবন এবং স্বদেশে ফেরার কোনো আশা না দেখে মরিয়া হয়ে অনেক রোহিঙ্গা নৌকাযোগে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে বিপজ্জনক যাত্রা শুরু করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ সালটি ছিল এই সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক বছর, যেখানে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা সাগরে ডুবে মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।
মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে ক্ষীণ। এমতাবস্থায়, যত দিন না রোহিঙ্গারা মর্যাদার সঙ্গে রাখাইনে ফিরে যেতে পারছে, তত দিন আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলোকে এই মানবিক সাহায্য সচল রাখার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

