ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৫:৫৫ এএম

সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের কান্না, আতঙ্ক আর ক্ষতির গল্প। আরও ভয়াবহ বিষয়; কিছু মানুষ এসব মর্মান্তিক পরিস্থিতিকে স্বার্থ হাসিলের সুযোগ হিসেবে দেখে। দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে তাদের মূল্যবান মালামাল লুট করে। যে ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

গতকাল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে একটি যাত্রীবাহী বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায়ও মালামাল লুটের অভিযোগ উঠে এসেছে। জানা যায়, এদিন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে র‌্যাম ভেঙে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। দ্রুত চালক ও তার সহকারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাসটিতে কোনো যাত্রী না থাকলেও তাদের মূল্যবান মালামাল ভর্তি ব্যাগ ও বস্তা ছিল। এদিকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ বাসটিকে উদ্ধার করে। তবে উদ্ধার অভিযান চলার আগে এবং পরে চুরির ঘটনা হয়েছে বলে জানান যাত্রীরা। রাজবাড়ী প্রতিনিধি সরেজমিনে একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। যাত্রীরা জানান, বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পর পানিতে ভেসে ওঠা বেশ কয়েকটি ব্যাগ ও মালামাল চুরি হয়। শুধু তাই নয়, বাসটি উদ্ধারের পরও ভেতরে থাকা ব্যাগ ও বস্তা নিখোঁজ হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়ার স্বস্তির মাঝেও নিজেদের কষ্টার্জিত সম্পদ হারানোর বেদনা তাদের তাড়া করে ফিরছে।

ইকবাল কবির নামের এক যাত্রী বলেন, আমরা যখন বিপদে পড়েছি, তখনো একদল মানুষ সুযোগ নিতে প্রস্তুত। এটা শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং আইনের দুর্বল প্রয়োগেরও প্রতিফলন। একজন অসহায় মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে লাভবান হওয়ার মানসিকতা সমাজের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। এ যেন কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ।

এর আগে গত ২৫ মার্চ এ ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ঢাকাগামী ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নদীতে পড়ে যায়। সে দুর্ঘটনার পর মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই সময়ও চুরির ঘটনা ঘটে।

এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৩ সালে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের হাসানপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর আহত ও অসহায় যাত্রীদের মালামাল লুট হয়। দুর্ঘটনার পর প্রশাসনকে মাইকিং করে লুট হওয়া মালামাল ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানাতে হয়েছিল। মাইকে বলা হয়েছিল, যারা অন্যের মালামাল নিয়েছেন, দয়া করে তা ফেরত দিন। অন্যথায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আপনাদের শনাক্ত করা হবে। এটি রোজার মাস, আল্লাহকে ভয় করুন।

সেই দুর্ঘটনার আহত যাত্রী মো. জাকির মোল্লা বলেন, আজও ভুলতে পারেননি সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। দুর্ঘটনার সময় আমি বগি থেকে ছিটকে পড়ি, আমার পা ভেঙে যায়। কিছুক্ষণ পর দুজন এসে আমাকে দাঁড়াতে সাহায্য করে। আমি ভেবেছিলাম সহায়তার জন্য এসেছে। পরে বুঝতে পারি, আমার মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে গেছে। ঘটনাটি আমাকে শুধু হতবাকই করেনি, মানবতা ও আইনের শাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ জাগে আমার মনে। জাকির আরও বলেন, দুর্ঘটনার পর অনেক স্থানীয় মানুষ উদ্ধার কাজে এগিয়ে না এসে আটকে পড়া যাত্রীদের মালামাল লুট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আহত ও রক্তাক্ত মানুষের আর্তনাদের মধ্যেও তারা মূল্যবান জিনিস চুরিকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা মানুষের জীবনে অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয় বয়ে আনে। সেই মুহূর্তে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও মানবিক আচরণ। কিন্তু যখন বিপদের মুহূর্তে সাহায্যের হাতের পরিবর্তে চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা  হয়; এটি শুধু অপরাধ নয়Ñ সমগ্র সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত; একই সঙ্গে আইনের দুর্বল কাঠামোর স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। তারা বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার এবং এমন ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।