ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

সিলেটে ‘জিরাকাণ্ড’

উঠে আসছে প্রভাবশালীদের নাম

সিলেট ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

সিলেট সীমান্তে চিনি চোরাচালানের পর এবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ভারতীয় জিরা’। গত কয়েক মাসে সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা এবং মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে কোটি কোটি টাকার চোরাই জিরার চালান জব্দ করা হয়েছে। শুধু চোরাচালানের বিশালতাই নয়, জনমনে সবচেয়ে বেশি গুঞ্জন ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এই ব্যবসার নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং তাতে জড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক নামগুলো, যার মধ্যে বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতার নামও আলোচনায় আসছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর কতিপয় নেতার নামও জড়িয়ে পড়ছে এই চক্রের সঙ্গে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিজিবি সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে সিলেট অঞ্চলের গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও ওসমানীনগরে একের পর এক জিরার বড় বড় চালান ধরা পড়ে। গত ১৬ মার্চ গোয়াইনঘাট উপজেলার সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের গোয়াইনঘাট লিঙ্ক রোড (বঙ্গবীর চেকপোস্ট) এলাকায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। এতে একটি ড্রাম ট্রাকে অভিনব কায়দায় বালুর নিচে লুকিয়ে রাখা ৭৬ বস্তা (তিন হাজার ৮০০ কেজি) ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। এ সময় ট্রাকচালক মো. জাকারিয়া হোসেন (২৩) ও হেলপার মো. আজমল হোসেনকে (২০) আটক করা হয়। 

গত ১৬ এপ্রিল কানাইঘাট উপজেলার ৭ নম্বর দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের রাইনপুর এলাকায় ১৯ বিজিবির (সিলেট ব্যাটালিয়ন) অধীন সুরইঘাট বিওপির জওয়ানরা একটি বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করেন। সে সময় সীমান্তের একটি পরিত্যক্ত ঘর বা গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয় ৯৯ বস্তা (চার হাজার ৯৫০ কেজি) ভারতীয় জিরা। এর সিজারমূল্য প্রায় ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এরপর ১২ মে ওসমানীনগর থানার গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় জেলা ডিবি পুলিশ এবং থানা পুলিশের একটি দল যৌথ অভিযান চালায়। এ সময় সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুল হামিদের মালিকানাধীন একটি বহুতল ভবনের নিচতলার গুদামে ভারতীয় জিরার বিশাল মজুত পাওয়া যায়। জব্দ করা হয় ৬০৩ বস্তা (১৮ হাজার ৯০ কেজি) অবৈধ জিরা। এই চালানের বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি ১২ লাখ টাকা। 

এই ঘটনার পরই মূলত সিলেটের চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিশালতা ও এর সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। একাধিক সূত্র দাবি করে, সিলেট বিএনপির একটি বলয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চোরাচালানের এই বিশাল চালান এসেছিল। এই চক্র নিয়মিত জিরা চোরাচালান করে আসছে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের হরিপুর-সংলগ্ন বালিপাড়া গ্রামে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালায়। স্থানীয় চোরাকারবারি জমির উদ্দিনের বসতবাড়িতে এই তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ৭৫ বস্তা (তিন হাজার ৭৫০ কেজি) ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা।

এই ঘটনার পর স্থানীয় মহলে জিরার চোরাচালান ও এর নেপথ্য সিন্ডিকেট নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে জৈন্তাপুরের সীমান্ত লাইনগুলো কারা নিয়ন্ত্রণ করছেÑ সেই বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, জৈন্তাপুর সীমান্ত বর্তমানে জিরা চোরাচালানের বড় ট্রানজিট পয়েন্টগুলোর একটি। এখানে সিন্ডিকেটের মূল কার্যক্রম চলে মূলত চারিকাটা ইউনিয়ন এবং হরিপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় পুলিশ ও এজাহার সূত্রে এই অঞ্চলের চোরাচালানের প্রধান সমন্বয়ক বা দলনেতা হিসেবে শাহজাহান নামে এক ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। চারিকাটা সীমান্তের বিভিন্ন গোপন পথ দিয়ে ভারতীয় জিরা এনে হরিপুর এলাকার বিভিন্ন অস্থায়ী গুদামে মজুত করা এই সিন্ডিকেটের মূল কাজ। গত বুধবার গভীর রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে ফতেপুর ইউনিয়নের বালিপাড়া গ্রামে জমির উদ্দিনের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৭ লাখ টাকা মূল্যের যে ৭৫ বস্তা জিরা উদ্ধার করেছে, সেটাও এই শাহজাহান সিন্ডিকেটেরই লাইন ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

সিলেটে বুঙ্গার চিনিকা-ের (চোরাচালানের চিনি) পরে নতুন করে ‘জিরাকা-’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মূলত রাজনৈতিক আশকারায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এই লাইনের নিয়ন্ত্রণ সাবেক এক আওয়ামী লীগ নেতার হাতে থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের একাংশের নাম ভাঙিয়ে এই শাহজাহান সিন্ডিকেট হরিপুর-বাগেরভাগ রুট সচল রেখেছে।

অপর রুট গোয়াইনঘাটের রুস্তমপুর, বিছনাকান্দি এবং ডৌবাড়ী ইউনিয়ন হয়ে পণ্য আসার ক্ষেত্রে পরিবহন ও কৌশল সবচেয়ে অভিনব। এখানে স্থানীয় ট্রিপ চালক ও প্রভাবশালী লাইনম্যানদের একটি চেইন তৈরি হয়েছে। গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি এলাকার জাকারিয়া হোসেন (বিছনাকান্দি ঘোরাগ্রামের চমক আলীর ছেলে) এবং বিছনাকান্দি ও রুস্তমপুর বেল্টের কয়েকজন চিহ্নিত ‘লাইনম্যান’ এই রুটের মূল চালিকাশক্তি। জাকারিয়াসহ স্থানীয় চালকদের ব্যবহার করে বালুভর্তি ড্রাম ট্রাকে করে বালুর নিচে জিরার বস্তা লুকিয়ে সিলেট শহরে পাঠানো হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি আহারকান্দি এলাকায় প্রায় ৪২ লাখ টাকার জিরা উদ্ধারের ঘটনায় জৈন্তাপুরের খারোবিলের মো. সেলিম মিয়া এবং লক্ষ্মীপুরের মো. আজমল হোসেনের নাম উঠে এসেছে। তারা গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্তের মধ্যবর্তী সংযোগের কাজ করে। গোয়াইনঘাটে পিয়াইন নদী এবং বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে চোরাচালান সিন্ডিকেট সক্রিয়, তাকে স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজন পদধারী নেতা প্রশাসনিক ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে সীমান্তবর্তী কোম্পানিগঞ্জ মূলত চিনি এবং ভারতীয় সুপারি চোরাচালানের জন্য বেশি পরিচিত হলেও গত দুই মাসে এই রুট দিয়ে জিরার ছোট ছোট চালান খালাস হচ্ছে। এখানকার মূল রুট হলোÑ ভোলাগঞ্জ দয়ালাবাজার, উৎমা সীমান্ত এবং কালাইরাগ এলাকা। এই এলাকাগুলোতে সীমান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে পণ্য খালাসের পর পাথর ও বালুর ট্রাকে করে সেগুলো সিলেট-কোম্পানিগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মহাসড়কে তোলা হয়। কোম্পানিগঞ্জের কালাইরাগ ও ভোলাগঞ্জ সীমান্তের চিহ্নিত চোরাকারবারি আলমগীর এবং স্থানীয় সুপারি চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নূর মিয়া সিন্ডিকেট বর্তমানে জিরার চালানে বিনিয়োগ করছে বলে তথ্য রয়েছে। কোম্পানিগঞ্জে চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সম্প্রতি স্থানীয় বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের একাংশের মধ্যে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর উপজেলা যুবদলের প্রভাবশালী এক নেতার অনুসারীরা ভোলাগঞ্জ লাইনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর থেকেই এই রুটে চোরাচালান আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে এই তিনটি উপজেলার রুটগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। তা হলো, বর্ডার এলাকায় বিজিবি বা পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে চোরাকারবারিরা এখন সীমান্তে পণ্য বেশি সময় রাখে না। ওপার থেকে মাল আসার পরপরই হরিপুর, বিছনাকান্দি বা ভোলাগঞ্জের স্থানীয় বসতবাড়ি বা ‘টিনশেড গুদামে’ ডাম্পিং করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক লাইনম্যানদের সবুজ সংকেত (টোকেন) পেয়ে সেগুলো ট্রাকে করে ছড়িয়ে পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত সরকারের পতনের পর সিলেটের সীমান্ত চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ ও ‘লাইন’ বদল হয়েছে। ওসমানীনগরের সোয়া কোটি টাকার জিরার চালানটি উদ্ধার করা হয় সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুল হামিদের বাড়ি থেকে। তবে এই ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত অঞ্চলের চোরাচালানের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে একটি নতুন সিন্ডিকেট, যেখানে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কিছু নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ‘আশীর্বাদ’ রয়েছে। এর আগে চিনির চালান এবং চোরাই পণ্যবাহী ট্রাক ছিনতাইয়ের অভিযোগে সিলেট মহানগরীর ২৫ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক নেতাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যাদের পরে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়।

ঠিক একই কায়দায় কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে আসা জিরার চালানগুলোকে নিরাপদে সিলেট শহর কিংবা দেশের অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী মহলের একাংশ ‘লাইনম্যান’ ও ‘টোকেন’ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জৈন্তাপুর ও ওসমানীনগর এলাকায় আলোচনা রয়েছে, রাজনৈতিক খোলস পাল্টে কিছু ব্যবসায়ী এখন স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে এই সিন্ডিকেট সচল রেখেছে।

ওসমানীনগরে জিরার চালান জব্দের পর চোরাচালান সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে জৈন্তাপুরের ‘মোহন মিয়া’ নামে এক ব্যক্তির নাম জোরালোভাবে সামনে আসে। যিনি বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া বুঝে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তবে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, ‘৫ আগস্টের পর আমি এই ব্যবসা ছেড়ে এখন বালুর ব্যবসা করছি।’

সচেতন মহলের দাবি, পুলিশ বা বিজিবি চোরাই মাল এবং সাধারণ চালকদের আটক করলেও কোটি কোটি টাকার চালানের মূল অর্থ জোগানদাতা এবং যে রাজনৈতিক গডফাদাররা পর্দার আড়াল থেকে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিচ্ছেন, তাদের নাম রহস্যজনক কারণে মামলার এজাহারে আসছে না।

এই বিষয়ে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বিএনপি চোরাচালান বা কোনো ধরনের অপকর্মকে প্রশ্রয় দেয় না। সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কেউ জড়িত কি না আমার জানা নেই। তবে বিগত দিনে যারা চিনি বা অন্য কোনো চোরাচালান কা-ে জড়িয়েছে, দল তাদের তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করে কঠোর বার্তা দিয়েছে। জিরা চোরাচালানের সঙ্গে যদি বিএনপির কোনো স্তরের নেতাকর্মীর নাম জড়ায়, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দল কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই।

জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, নানা সময়ে চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পথে চোরাচালান পণ্য নিয়ে এসে বিভিন্ন গোডাউনে মজুত করে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে গোডাউন থেকে পণ্য সরিয়ে নেয়। চোরাচালান রোধকল্পে পুলিশ অভিন্ন কৌশলে গুদামের সন্ধানে নামে। বেশ কয়েকটি গুদাম ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে অভিযান চালানো হবে।