বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করতে আগ্রহী তুরস্ক। বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে আঙ্কারা। তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসে এমন আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
একই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের নতুন সরকার বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের পররাষ্ট্রনীতি “বাংলাদেশ প্রথম দর্শনে পরিচালিত হচ্ছে। ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ মানে এই নয় যে বাংলাদেশ একা চলবে। এর অর্থ হচ্ছে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সীমান্তের বাইরে বন্ধু ও অংশীদার রয়েছে, কোনো প্রভু নয়।” তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি সম্মান, অভিন্ন স্বার্থ এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকেও সরকার অপরিহার্য বলে মনে করে।’
গত মার্চে আঙ্কারায় বৈঠকের প্রায় তিন মাস পর ঢাকায় আবারও মুখোমুখি হন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে প্রথমে দুই দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। পরে দুই মন্ত্রী প্রায় ৩০ মিনিট একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর ফাঁকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রতœসম্পদ রক্ষা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, মহাফেজখানার নথি ও গ্রন্থাগারসামগ্রীর সংরক্ষণ, ডিজিটাইজেশন এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া ইউনেসকোর ১৯৭০ সালের কনভেনশনের আলোকে সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ আমদানি, রপ্তানি ও মালিকানা হস্তান্তর প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং সাংস্কৃতিক সম্পদের তালিকাভুক্তি ও নথিবদ্ধকরণেও সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
বৈঠকে তুরস্ককে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও ক্রমবর্ধমান বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে তুর্কি উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। খলিলুর রহমান বলেন, বস্ত্র ও পোশাক, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।’ তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ১৩০ কোটি ডলারের বাণিজ্যকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগ খুঁজে দেখা হচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্পে, আমাদের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি।’
এফটিএ, পিটিএ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাব : বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বড় আকারের তুর্কি বিনিয়োগ আসতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নতুন উদ্যোগ : বাংলাদেশ তুরস্কের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ লক্ষ্যে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা বা উন্নয়নে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি তুরস্কে বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী।
রোহিঙ্গা সংকটে পাশে থাকবে তুরস্ক : রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার।’ এ সময় রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থনের জন্য দেশটির প্রতি ধন্যবাদ জানান তিনি। এ সময় রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেয় তুরস্ক। হাকান ফিদান বলেন, ‘এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচ্যসূচিতে রাখার জন্য আমরা নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তনের পক্ষেও তুরস্ক কাজ চালিয়ে যাবে। এই সফরের অংশ হিসেবে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হতে তুরস্কের সমর্থনের জন্য দেশটির সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে পাওয়া সমর্থন, উৎসাহ ও সহযোগিতা আমি কখনো ভুলব না।’ এদিকে ড. খলিলুর রহমানকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানান ফিদান। তিনি বলেন, এটি বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতিফলন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা এবং ড. খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি দায়িত্ব সফলভাবে পালন করবেন বলে তুরস্কের মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ফিদান স্মরণ করিয়ে দেন, সম্প্রতি ড. খলিলুর রহমান তুরস্ক সফর করেছেন। এই সফর দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করার অভিন্ন সংকল্পকেই তুলে ধরে।
বিশ্বশান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব : সংবাদ সম্মেলনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংঘাত নিয়েও কথা বলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অগ্রগতিকে স্বাগত জানান এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ-পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে গাজা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ফিদান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা ব্যাহত করার অভিযোগ এনে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করা এবং ওই অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি দূর করা। ফিদান আরও বলেন, বাংলাদেশকে তুরস্ক সঙ্গে নিয়ে নতুন উদ্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করবে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরেও শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি বাড়াতে কাজ করবে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে সিউল থেকে ঢাকায় পৌঁছান হাকান ফিদান। আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে তার ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

