ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

বাজেট উপস্থাপন আজ

দাম বাড়ছে-কমছে যেসব পণ্যের

শাহীনুর ইসলাম শানু
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৫:১৫ এএম

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার। এবার কিছু পণ্যের ওপর থেকে উৎসে কর হ্রাস এবং কর আরোপিত করার প্রস্তাব পেশ করবেন সরকারের পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন প্রস্তাবের আলোকে কিছু পণ্যের দাম কমতে ও বাড়তে পারে। 

আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামো তৈরির প্রস্তাব করছে সরকার, যার লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। আসছে বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

এবারের বাজেটে জনগণকে ভোগ্যপণ্যের দাম কমিয়ে স্বস্তি দিতে যাচ্ছে সরকার, যার কারণে কিছু পণ্যের ওপর থেকে উৎসে কর কমানোয় দাম কিছুটা কমতে পারে। অন্যদিকে, কিছু বিলাসী ও তামাকপণ্যের ওপর নতুন করে করারোপ হওয়ায় দাম বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড় দেবে সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

দাম কমতে পারে যেসব পণ্যের

খাদ্য : মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য যেমনÑ ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কমতে পারে। কারণ উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মসলা, খেজুর, পাঙাশ মাছের ফিলেট, পোলট্রি ও ডেইরি খাতের যন্ত্রাংশ, মৃতদেহ সংরক্ষণে মর্চুয়ারি, ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি কাঁচামাল, ওষুধশিল্পে ১৭টি, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন, এপিআই তৈরির ৫১টি কাঁচামালের আমাদানি শুল্ক কমায় দাম কমবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির চলাচলে ২১ ধরনের ডিভাইসের ওপর দাম কমতে পারে।

স্বাস্থ্য খাত : কর ছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানোয় সেবামূল্য কম হবে।

স্বর্ণ : উৎসে করের উচ্চহারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের সরবরাহ এখনো অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে বিধায় সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। এই ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক খাতে এনে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব থাকছে।

ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ : ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে, যার কারণে দাম কমবে বলে মনে করে সরকার। কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশে কমানোয় দাম কিছুটা কমবে।

দেশি মোবাইল : স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানো হয়েছে, যার কারণে কমবে দাম। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছে থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে হ্রাস, রিফাইনারি কর্তৃক জ¦ালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানো হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন : দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে রেয়াতি সুবিধা দেবে সরকার। পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার প্রস্তাব থাকছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ বিলের ওপর ব্যবহারকারীদের সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা প্রদানের সুযোগ থাকছে, যার কারণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্রাংশের দাম কমতে পারে।

ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও গাড়ি, ই-বাইক : দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়ায় দাম কমবে। একই সঙ্গে সব ধরনের ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বিআরটিএতে রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম আয়করের পরিমাণ ২ লাখ টাকা কমিয়ে ইলেক্ট্রিক গাড়ির ২০০, ৩০০, ৪০০ ও ৪০০ কেডব্লিউর বেশি ক্যাপাসিটির ভিত্তিতে যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার এবং ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি, যার কারণে দামের পার্থক্য থাকতে পারে।

বাজেট প্রস্তাবে যা থাকছে : দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। জীবাশ্ম জ¦ালানিনির্ভর পরিবহনের বিকল্প হিসেবে দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনে এবং ইলেকট্রিক গাড়ির যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা দিয়ে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছে সরকার। যেসব প্রতিষ্ঠান চার চাকা ও তিন চাকার বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের বডি তৈরি, ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং ও অ্যাসেম্বলিং সম্পন্ন করার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উচ্চমূল্য সংযোজন করবে, তাদের ক্ষেত্রে উপকরণ ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছাড়া সব ধরনের শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করছে সরকার। একই সঙ্গে, স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাট এবং অন্য সব ধরনের শুল্ক-কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদান-পূর্বক একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। এসব পণ্যের দাম আগামীতে কমতে পারে।

ব্যাটারি : দেশে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আগামী ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত এসব পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা দিয়ে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করেব সরকার, যার কারণে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।

বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম

তামাকজাত পণ্য আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য নতুন কোড সৃজন-পূর্বক ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থাকছে, যার কারণে তামাকজাত পণ্যের ফের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মাদকের দাম।

ক্ষতিকর গাড়ি : জীবাশ্ম জ¦ালানিচালিত গাড়ি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ককর বাড়াচ্ছে সরকার। পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোলচালিত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে চায় সরকার। পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যান ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে মধ্যম সারির ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনবিশিষ্ট আমদানি করা গাড়ির ওপর বিদ্যমান সামগ্রিক করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব থাকছে।

পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোলচালিত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে এবং পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যান ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে মধ্যম সারির ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনবিশিষ্ট আমদানি করা গাড়ির ওপর বিদ্যমান সামগ্রিক করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছে সরকার।

পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিন : পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিন উৎপাদনকারী শিল্পকে যথাযথ প্রতিরক্ষণ প্রদানে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব থাকছে। 

বাইসাইকেল : স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ ফ্রি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সঙ্গে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থাকবে।

ট্রান্সফরমার শিল্প : স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার শিল্পকে শক্তিশালী শুল্ক প্রতিরক্ষণ প্রদানে ট্রান্সফরমার আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার, একই সঙ্গে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব থাকছে।

গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপার : কাগজশিল্পের স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিরক্ষণের লক্ষ্যে গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপার আমদানির ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার, একই সঙ্গে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থাকছে, যার কারণে আগামীতে এসবের দাম বাড়তে পারে।