আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১টায় (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে ১২ জুন) মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব। তার আগে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চ আলোকিত করবেন পপ তারকা শাকিরা ও বার্না বয়। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সংগীত ‘দাই, দাই’-এর সুরে দুলবে স্টেডিয়াম, সঙ্গে থাকবেন জে বালভিন, টাইলা, মানা ও আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ। জাঁকজমকপূর্ণ এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে মেক্সিকো সময় বেলা সাড়ে ১১টায় এবং বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায়। এরপরই মাঠে গড়াবে একটি বল। আর সেই বলের পেছনে ছুটবে গোটা পৃথিবী।
বাংলাদেশের ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত পেরোলেই যেন বদলে যাবে পৃথিবীর ছন্দ। কয়েক সপ্তাহের জন্য পৃথিবী একটি অভিন্ন ঠিকানায় পরিণত হবেÑ ফুটবল। রাষ্ট্রের সীমারেখা, ভাষার ভিন্নতা কিংবা সংস্কৃতির দূরত্ব তখন আর বড় হয়ে থাকবে না। লন্ডন থেকে লাতিন আমেরিকা, ঢাকা থেকে দোহা, টোকিও থেকে টরন্টোÑ সবখানে একই প্রশ্ন, একই উত্তেজনা, একই স্বপ্নÑ কে জিতবে বিশ্বকাপ?
উদ্বোধনী ম্যাচেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি : এ যেন ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেরই পুনরাবৃত্তি। সেবার জোহানেসবার্গের সকার সিটিতে উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচটি শেষ হয়েছিল ১-১ গোলে ড্রয়ে। ১৬ বছর পর আবারও উদ্বোধনী মঞ্চে মুখোমুখি দুই দল।
ঘরের মাঠে বিপুল সমর্থনের সুবিধা পাবে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১৫ নম্বরে থাকা মেক্সিকো। শেষ আট আন্তর্জাতিক ম্যাচের ছয়টিতেই গোল না খাওয়া দলটির রক্ষণভাগ অন্যতম শক্তিশালী। অন্যদিকে আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে মূল পর্বে এসেছে র্যাঙ্কিংয়ে ৬০তম দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ ১১ ম্যাচের ৯টিতে গোল করা বাফানা বাফানারা শুরুতেই অঘটনের স্বপ্ন দেখছে।
এবার নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিনবার আয়োজক হওয়ার রেকর্ড গড়ছে মেক্সিকো। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল তাদের সেরা সাফল্য। এবার সেই সীমা ভাঙার স্বপ্ন এল-ত্রিদের চোখে।
বৃহত্তম বিশ্বকাপের নতুন যুগ : এবারের বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি আসর নয়, এটি ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা। ৩২ দলের বদলে এবার অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। আট গ্রুপের জায়গায় ১২ গ্রুপ। ম্যাচ সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৪। এক মাসের টুর্নামেন্ট বিস্তৃত হয়েছে ৩৮ দিনে। এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার নয়, সম্ভাবনারও। আরও বেশি দেশের জন্য খুলে গেছে বিশ্বমঞ্চের দরজা। ফলে অঘটনের সম্ভাবনাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তারকারাই সব গল্পের নায়ক হন না। কোনো অখ্যাত তরুণ হঠাৎ করেই বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়ে দিতে পারেন। কোনো গোলরক্ষকের একটি সেভ কিংবদন্তি হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো আন্ডারডগ দল লিখে ফেলতে পারে বিস্ময়ের মহাকাব্য।
বিশ্বের অভিন্ন ভাষা : মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন আয়োজন খুব কমই আছে, যা একই সময়ে এত মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। ফুটবল সেই বিরল শক্তির নাম। মাঠে খেলবেন ২২ জন ফুটবলার, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লড়াইয়ে অংশ নেবে কোটি কোটি মানুষ। গ্যালারির গর্জনের আড়ালে থাকবে এক বাবার স্বপ্ন, যিনি সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান প্রিয় দলের জয়। থাকবে সেই বৃদ্ধ সমর্থকের অস্থিরতা, যিনি বহু বিশ্বকাপ দেখেও ম্যাচের আগে শিশুর মতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। থাকবে সেই কিশোর, যে টেলিভিশনের পর্দায় কোনো তারকাকে দেখে নিজের ভবিষ্যৎ আঁকে। ফুটবল তাই শুধু খেলা নয়, এটি মানুষের অনুভূতির সবচেয়ে জীবন্ত নাট্যমঞ্চ।
মেসি, নেইমার, রোনালদোদের কি শেষ মহারণ : বিশ্বকাপের আলো সবচেয়ে বেশি থাকবে তারকাদের ওপর। লিওনেল মেসি কি পারবেন টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ইতালি ও ব্রাজিলের পাশে আর্জেন্টিনাকে বসাতে? ২০২২ সালে লুসাইলের আলোয় ট্রফি হাতে তুলে তিনি বলেছিলেন, সেটিই হয়তো শেষ। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সেও তিনি ফিরে এসেছেন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে।
অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ানদের বিশ্বাস, ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার আসবে কাক্সিক্ষত ‘হেক্সা’। নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে এটি। তার হাতে কি উঠবে ফুটবলের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ট্রফি?
আর আছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর স্বপ্ন। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মহাতারকার ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপই একমাত্র অপূর্ণতা। পর্তুগালের সোনালি প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কি শেষ পর্যন্ত মাথায় তুলতে পারবেন সেই মুকুট?
ডার্ক হর্স হিসেবে অপেক্ষায় থাকবে জার্মানি। টানা দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর ডাই ম্যানশ্যাফট কি আবারও ফিরবে সিংহাসনের লড়াইয়ে?
ভবিষ্যদ্বাণী বনাম আবেগ : জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্তে গত তিনটি বিশ্বকাপের নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তার গাণিতিক মডেল বলছে, এবার ফাইনালে মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগাল। আর প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে ভিডিও গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইএ স্পোর্টস, যারা আগের চার বিশ্বকাপের ফল সঠিকভাবে অনুমান করেছিল, তাদের বিশ্লেষণে এবার চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
কিন্তু পৃথিবীর বহু প্রান্তে এসব হিসাব-নিকাশের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আবেগ। সেখানে বিশ্বকাপ শুরু মানেই দুটি নামÑ ব্রাজিল অথবা আর্জেন্টিনা। যুক্তি হেরে যায় ভালোবাসার কাছে, পরিসংখ্যান হার মানে পতাকার রঙে।
আবেগে রাতজাগা বাংলাদেশ : বিশ্বকাপের এত কাছে এসে বাংলাদেশকে আগে কখনো এতটা নীরব দেখা যায়নি। ছাদে ছাদে আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের পতাকার জোয়ার এখনো তেমন চোখে পড়ছে না। কিন্তু বিশ্বকাপ বাংলাদেশের আবেগের জন্য অপেক্ষা করে না। বল মাঠে গড়ালেই বদলে যাবে দৃশ্যপট। চায়ের দোকানে, অফিসে, ক্যাম্পাসে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে, রাতজাগা বসার ঘরে শুরু হবে তর্ক-বিতর্ক, ভবিষ্যদ্বাণী আর উল্লাস। কারণ ফুটবল শুধু মাঠের গল্প নয়, এটি মানুষের গল্প।
উৎসবের আড়ালে অশান্ত পৃথিবী : তবু বিশ্বকাপের আলোর বিপরীতে থাকবে অন্ধকারের কিছু গল্পও। শাকিরা ও বার্না বয়ের গানে যখন দুলবে ফুটবলের পৃথিবী, তখনো যুদ্ধের আগুনে পুড়বে বিশ্বের কিছু অঞ্চল। ইরানের স্কুলে বোমা হামলায় নিহত শিশুদের মুখ, মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ, অর্থনৈতিক মন্দায় বিপর্যস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসÑ এসবও থাকবে একই পৃথিবীতে। বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতা মুছে দিতে পারবে না। তবে কিছু সময়ের জন্য মানুষকে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেবে।
নতুন ইতিহাসের অপেক্ষা : প্রতিটি ম্যাচ লিখবে নতুন অধ্যায়। প্রতিটি গোল সৃষ্টি করবে নতুন স্মৃতি। প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি উদযাপন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। আগামী ৩৮ দিন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই আকাশের নিচে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন পরিচয় নিয়েও যুক্ত থাকবে এক অভিন্ন আবেগে। কেউ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে, কেউ কাজের ফাঁকে স্কোর দেখবে, কেউ পরিবারের সঙ্গে বসে উপভোগ করবে ফুটবলের শ্রেষ্ঠ মঞ্চ। কারণ ফুটবল এমন এক খেলা, যেখানে একটি বলের গতিপথ বদলে দিতে পারে কোটি মানুষের অনুভূতি।
আজ মধ্যরাতের পর সেই মহাযাত্রা শুরু হবে। এক বলের পেছনে আবারও ছুটবে পৃথিবী। জন্ম নেবে নতুন কিংবদন্তি, লেখা হবে নতুন ইতিহাস। আর শেষ রাতে, যখন কোনো অধিনায়ক আতশবাজির আলোয় ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন আকাশের দিকে, তখন এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত ইতিহাস হয়ে যাবে।

