সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে শোবিজ জগতের বিভিন্ন চিত্রনায়িকা ও মডেলদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং প্রভাব বিস্তারের গুঞ্জন প্রচলিত রয়েছে। র্যাবের ডিজি, ডিএমপি কমিশনার ও আইজিপির দায়িত্বে থাকাকালীন দেশের শোবিজ জগতের একাধিক উঠতি মডেল ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আসা নায়িকাদের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। একাধিক সংবাদ পাঠিকার সঙ্গে বেনজীরের সম্পর্ক ছিল, বিদেশে পালানোর পর এক উঠতি মডেল ও এক সংবাদ পাঠিকার সঙ্গে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, যৌন উত্তেজক অঙ্গভঙ্গি ও অশালীন বাক্য প্রয়োগ করেন বেনজীর। তিনি তার ক্ষমতা ও বিপুল অবৈধ অর্থ ব্যবহার করে বিনোদন জগতের একাংশের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য আধিপত্য তৈরি করেছিলেন।
এদিকে বেনজীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুবাইয়ে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও ঘনিষ্ঠরা অন্য দেশে পালাতে চেষ্টা করছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, বেনজীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্যরাও গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন। ইতিমধ্যে তারা গাঢাকা দিয়েছেন। বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করেছে। এর মধ্যে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও নায়ায়ণগঞ্জের গডফাদারখ্যাত শামীম ওসমান সেখানে পরিবারসহ বিলাসী জীবন-যাপন করছেন, তারা এখন অন্য কোনো দেশে চলে যেতে চান।
বেনজীরের নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য, ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়া, বাসা থেকে মডেলদের তুলে আনা, অন্যের সম্পত্তি রাতের আঁধারে দখল, ভিন্ন মতের লোকদের তুলে এনে গুম-খুনের মতো অপরাধের সঙ্গেও তার নাম আসে। অনেকে তার এসব কর্মকা- জানলেও বলার সাহস পেতেন না। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অভিজাত শহর আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তার বিলাসবহুল জীবনযাপনের খবর পাওয়া যাচ্ছিল নানা সূত্রে। দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
দেশের বিনোদন জগৎ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে একাধিক মডেল ও চিত্রনায়িকার সম্পর্কের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বা বহুল আলোচিত বিষয় হিসেবে পরিচিত। বেনজীর আহমেদের বিপুল ক্ষমতার দাপট এবং পর্দার আড়ালের এই যোগাযোগের নানা দিক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য ও বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। শোবিজ জগতের তারকাদের পছন্দ অনুযায়ী সুবিধামতো স্থানে ডেকে নিতেন। আর এতে সহায়তা করতে তারই বেশ কয়েকজন সহযোগী। এর ছিলেন কয়েকজন পুরুষ তারকা এবং বাহিনীর অনুগতরা।
বেনজীর আহমেদ তার ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সময় বেশ কয়েকজন মডেল ও উঠতি নায়িকাকে গুলশান-বনানীর বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গাড়ি এবং কোটি কোটি টাকা উপহার দিয়েছিলেন। র্যাবের ডিজি থাকাকালীন বিভিন্ন বড় ইভেন্ট বা সুন্দরী প্রতিযোগিতার স্পন্সরশিপ এবং সেগুলোর আড়ালে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে মডেলদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তার নাম নানাভাবে এসেছে। বিনোদন জগতের ভেতরে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, যারা এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে নাটকের বাজেট, সিনেমার কাস্টিং এবং বিভিন্ন ক্লাবের মেম্বারশিপ নিয়ন্ত্রণ করত।
বেনজীর তার আইজিপি এবং র্যাবের মহাপরিচালক পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তার ‘নারীঘটিত গোপনীয়তা’ এবং ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে নানা বক্তব্য দিয়েছেন, যা ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে চর্চিত হয়েছে।
এক চিত্র পরিচালকের মাধ্যমে বেনজীরের সঙ্গে পরিচয় হয় চিত্রনায়িকা কেয়ার। এরপর নিয়মিত কেয়ার সঙ্গে বিশেষ একটি ফ্ল্যাটে মিলিত হতেন বেনজীর। কেয়াকে রক্ষিতা বানিয়ে রাখেন বেনজীর। কিন্তু পরিবারে অভাবের কারণে কেয়া যখন এই শৃঙ্খল থেকে বেরোতে চান, তখন বেনজীর কেয়াকে হুমকি দেন। পরে কেয়া লুকিয়ে লুকিয়ে মিডিয়ার ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন করে অভিনয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই খবর বেনজীরের কানে এলে বেনজীর কেয়াকে মারধর করেন। পরে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে কেয়াকে গুলশানের একটি বাসায় কলগার্ল সাজিয়ে আটক করায় বেনজীর। কেয়ার এই খবরটি পরে পুলিশ সদর দপ্তর মিডিয়ার মাধ্যমে বেশ চাউর করে।
কেয়াকে আটকে রাখার সেই বিষয়ে কেয়ার মা সে সময় বলেছিলেন, ‘আমার মেয়েকে অভিনয় থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে এনে দিনের পর দিন নষ্ট করেছে এই ভদ্রবেশী পুলিশ কর্মকর্তা। তার কথা না শোনার অপরাধে কেয়াকে অনেক মারধর করেছে। পরে পুলিশ দিয়ে পতিতা বানিয়ে অ্যারেস্ট করে ওর জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে এই বিচার ছেড়ে দিয়েছি। আল্লাই বেনজীর পাষ-ের বিচার করবেন।’
কেয়ার এই ঘটনার পর বেনজীরের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে বিদ্যা সিনহা মিমের। এটা ছিল বিনোদন জগতে ওপেনসিক্রেট ঘটনা। মিমকে নিয়ে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের প্রভাবশালী ভাগিনা ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বোরহানউদ্দিন পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে বেনজীরের দ্বন্দ্বের ঘটনায় সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ যায়। তবুও দমানো যায়নি বেনজীরকে। কারণ হিসেবে সে সময় আওয়ামী লীগের নেতারা বলতেন, গুম-খুন ও বিরোধী দল দমনে বেনজীর ছিলেন পারদর্শী।
চিত্রনায়িকা নিপুণ ও শিরিন শিলা, ছোট পর্দার অভিনেত্রী তারিন জাহান, উর্মিলা শ্রাবন্তী কর ও সোহানা সাবাসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী ঘরানার শোবিজ তারকার সঙ্গে বেনজীরের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাদের নিয়ে এবং তাদের মাধ্যমে উঠতি নায়িকা-অভিনেত্রী-মডেলদের নিয়ে বিভিন্ন গোপন পার্টির আয়োজন করতেন বেনজীর। এসব পার্টির আওয়ামী লীগের নেতারা ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা হাজির হতেন। এসব পার্টির আয়োজনের দায়িত্ব পেতেন বেশ কয়েকজন নায়ক ও মডেল।
দুবাইয়ে অবস্থানকালে বেনজীরের সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত আওয়ামী আত্মগোপনে থাকা নেতারা নিয়মিত দেখা করতেন। এর বাইরে অন্য দেশে থাকা আওয়ামী নেতা ও দলটির ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অডিও-ভিডিও কলে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, পাশাপাশি পূর্ববর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার ও বর্তমান তারেক রহমানের সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা পরিকল্পনায় অংশ নিতেন। দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিতেন। তাদের কাছে হুন্ডির মাধ্যমে টাকাও পাঠাতেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বেনজীর অনুগত গোপনে বিভিন্ন তথ্য পাচার করতেন এবং নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত ছিলেন। বিগত সময়ে বিদেশে আত্মগোপনে থাকার সময় বেনজীর অডিও-ভিডিও বার্তায় সরকার পতনের ডাক দিয়েছেন।
নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সরাসরি যোগাযোগ রাখত, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নামের তালিকা প্রকাশ করেনি। মূলত ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং দুবাই বিমানবন্দরের আধুনিক ফেস রিকগনিশন (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির সহায়তায় গত ১২ জুন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঢাকা বোট ক্লাব বিতর্ক মূলত চিত্রনায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও, পরবর্তীতে তা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক দুর্নীতি এবং অবৈধ জমি দখলের এক বিশাল কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয়। ওই ক্লাবের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন বেনজীর আহমেদ। পরবর্তীতে বোট ক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নাসির মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে পরীমণির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সাভারের বিরুলিয়ায় তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত এই ক্লাবটি বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ২০২১ সালে প্রথম তীব্র বিতর্কের মুখে পড়ে। বেনজীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর চিত্রনায়িকা পরীমণি ফেসবুকে এক শব্দের প্রতিক্রিয়া ‘মজা’ লিখে পোস্ট করেন। এই সংক্ষিপ্ত ও রহস্যময় প্রতিক্রিয়াটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকে ধারণা করেন, অতীতে তার ওপর হওয়া আইনি হয়রানির পেছনে বেনজীর আহমেদের হাত ছিল বলেই তিনি এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
২০২৪ সালের মে মাসে দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর বেনজীর আহমেদ যখন সপরিবারে দেশ ছাড়েন, তখন তাকে বিমানবন্দরে পালিয়ে যেতে শাহেদা সুলতানা নামের একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা (তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত এসপি) সরাসরি সহায়তা করেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফাঁস হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই নারী কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদের সব কাগজপত্র হাতে নিয়ে তার আগে আগে হেঁটে তাকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তুলে দিচ্ছেন। একজন বিতর্কিত আসামিকে এভাবে নারী কর্মকর্তার প্রটোকল দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
গত ১২ জুন দুবাই বিমানবন্দরের আধুনিক ফেস রিকগনিশন (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির সহায়তায় আকস্মিক গ্রেপ্তার করা হয় বেনজীরকে। দুবাইয়ে তার যোগাযোগের নেটওয়ার্ক নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। দুবাই পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় বেনজীরের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছাড়াও পর্তুগালসহ একাধিক দেশের পাসপোর্ট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসের অনুমতিপত্র (রেসিডেন্সি পারমিট) পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক এসব নথিপত্র তৈরি এবং দুবাইয়ে দীর্ঘ মেয়াদে থাকার বন্দোবস্তে নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী ও কনসালটেন্সি এজেন্সির সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। বাংলাদেশ থেকে দুবাইয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে, তা বজায় রাখতে দুবাইভিত্তিক কিছু হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং রিয়েল এস্টেট এজেন্টের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তিনি সেখানে নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছিলেন। ইন্টাপোলের রেড নোটিশ জারি হওয়ার পর, প্রত্যর্পণ এড়াতে এবং দুবাইয়ের আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য তিনি স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ল ফার্ম এবং আইনজীবীদের একটি প্যানেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন।
২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায়, আইজিপি বেনজীর ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারীদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল কনফারেন্সে অংশ নিয়ে দেশের বিরুদ্ধে এবং পুলিশ বাহিনীর সম্পর্কে ষড়যন্ত্রমূলক মন্তব্য করেছেন। এই ঘটনার পর তার কর্মকা-ের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন।

