ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দিল্লিতে প্রবেশে বাধা

ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েন

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:১৬ এএম

চলতি মাসের শুরু থেকেই সীমান্তে পুশইনের নামে উৎপাত চালাচ্ছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কঠোর অবস্থানের কারণে অবৈধভাবে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দিয়ে পুনইন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ নিয়ে দু’দেশের সীমান্তে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে রোববার রাতে ইমিগ্রেশন জটিলতা দেখিয়ে দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ানকুমার তুলশীদাস বাধেকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার বিএনপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে উষ্ণতা দেখা গেলেও ডা. জাহেদ ও পুশইন ইস্যুসহ কিছু বিষয়ে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে নতুন করে উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে ডেকে ঢাকার প্রতিবাদপত্র তার হাতে তুলে দিয়েছেন তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লি বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দেশে ফিরে আসার ঘটনাটিকে ‘অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেন।

সোমবার থেকে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু বিমানবন্দরে তাকে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখে ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। তাকে দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়টিও তারা স্পষ্ট করছিল না। এ পরিস্থিতিতে জাহেদ উর রহমান দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটটিনের খবরে বলা হয়, জাহেদ উর রহমানকে বেশকিছু সময় বিমানবন্দরে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দিলেও উপদেষ্টা ডা. জাহেদ তাতে সম্মত হননি।

পরে তিনি ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’ এবং দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার প্রতিবাদে সরকারি সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। দিল্লি থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকেরা দিল্লির ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করেননি উপদেষ্টা।

এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের খবর আসে। ঠিক তখন প্রতিমন্ত্রীর পদ মার্যাদার একজন উপদেষ্টাকে কেন বিদেশে গিয়ে এ  রকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলো, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনায় বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট (লাল পাসপোর্ট) না নিয়ে তার সাধারণ (সবুজ) পাসপোর্টে সার্ক ভিসা নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। তবে এই তথ্যের সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে এক ধরনের উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এমনিতেই কিছুদিন ধরে দেশের সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীর শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক শেষে সরকারের এ পর্যায়ের কোনো কর্তাব্যক্তি বিদেশে গেলে সেখানে বাংলাদেশ মিশনের কোনো প্রটোকল কর্মকর্তা তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকেন। এক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন উপদেষ্টার সফর নিয়ে সঠিকভাবে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছে কি নাÑ সেই প্রশ্নও উঠছে। কিন্তু হাইকমিশন থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি আসেনি।

তবে সংবাদমাধ্যমে আসা খবরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ হাইকমিশন গত শুক্রবারই উপদেষ্টার এই সরকারি সফরের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক পত্র (নোট ভারবাল) দিয়েছিল। এমনকি বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ ব্যক্তিগতভাবেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে কেন উপদেষ্টাকে ইমিগ্রেশনে হেনস্তা করা হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটটিন সূত্রের বরাত দিয়ে লিখেছে, ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি নজরদারি তালিকায় (ওয়াচ লিস্ট) উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের নাম থাকায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। সে কারণেই বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাময়িকভাবে আটকে রাখেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পষ্টতই একটি প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম-সংক্রান্ত একটি ‘কালো তালিকা’ থেকে জাহেদ উর রহমানের নাম আগেই সরিয়ে ফেলা হলেও অভিযোগ রয়েছে, তা ইমিগ্রেশনের তালিকায় রয়ে গিয়েছিল। যে কারণে তিনি পৌঁছানোর পরই সতর্কতা তৈরি হয়। পরে এই অসঙ্গতি শনাক্ত ও সমাধান করার পর কর্মকর্তারা তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেন। কিন্তু ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের আচরণ যথাযথ না হওয়ায় উপদেষ্টা তার পাসপোর্ট ফেরত চান এবং দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএপফর অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা চলছেই। সেই পুশইন প্রচেষ্টা ঠেকাচ্ছে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড-বিজিবি। পুশইন ইস্যুতে ভারত স্পষ্ট কথা না বললেও ঢাকা স্পষ্ট জানিয়েছে, এই পুশইন গ্রহণ করা হবে না। এই ইস্যুটি বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি নতুন স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিক কূটনৈতিক বার্তার মাধ্যমে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও সহযোগিতার ওপর আরও প্রভাব পড়তে পারে।

দুই-তিন দিন আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, ইতোমধ্যে আমরা ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছি দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। বিজিবি সজাগ আছে এবং কোনোভাবেই এটি আমরা গ্রহণ করছি না। সম্প্রতি আমরা চেন্নাই থেকে ৩৪ জনকে ফেরত এনেছি। অবৈধ নাগরিকদের আদান-প্রদানে দুই দেশেরই একটি মেকানিজম বিদ্যমান আছে। সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কথা বলতে হবে। আমরা যত রকম ডিপ্লোমেটিক ওয়ে আছে, সেটি ফলো করছি।