ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বেনজীরকে ফেরানোর চ্যালেঞ্জে সরকার

ইকবাল হাসান ফরিদ
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:১৭ এএম

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম-নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত এই সাবেক পুলিশপ্রধানকে ফিরিয়ে আনতে এখন একই সঙ্গে চলছে আইনি, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি চ্যালেঞ্জ। বেনজীর দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ায় যতটা আলোড়ন তৈরি করেছে, তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পথ তার চেয়েও বেশি জটিল। আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, আদালতের শুনানি এবং অভিযুক্তের সম্ভাব্য আইনি প্রতিরোধ মিলিয়ে সামনে রয়েছে দীর্ঘ এক পথযাত্রা।

প্রশ্ন উঠেছে, শেষ পর্যন্ত কি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে? নাকি আন্তর্জাতিক আইনের জটিল গোলকধাঁধায় আটকে যাবে তাকে ফেরানোর প্রক্রিয়া?

জানা গেছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে আটক করে আমিরাতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এর পর থেকেই শুরু হয়েছে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সময় গণনা। ইউএইর প্রচলিত আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (৩০ দিন) সংশ্লিষ্ট দেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দিতে হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হলে আটক ব্যক্তির জামিন বা মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে এখন সময়ের সঙ্গেই লড়ছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলাসংক্রান্ত নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, সম্পদ জব্দের তথ্য এবং অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ।

দুদকের তদন্তে ইতিমধ্যে উঠে এসেছে চাকরিজীবনের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদের তথ্য। দেশে ও বিদেশে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের নানা তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলার বিচার চলছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে শুধু দুর্নীতির অভিযোগই নয়, আরও গুরুতর অভিযোগ হিসেবে সামনে এসেছে গুম, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়গুলো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এসব অভিযোগে জারি হওয়া একাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নথি সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রত্যর্পণ আবেদনের সঙ্গে সেগুলোও যুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে ট্রাইব্যুনালেও হাজির করা হবে। বিচারাধীন মামলায় আদালতে উপস্থাপন এবং তদন্তাধীন মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া অর্থ পাচার, বিদেশে সম্পদ গঠন, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা নিয়েও নতুন তদন্ত শুরু হতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও যুক্ত হওয়ায় মামলার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। কারণ এসব অভিযোগ বিশ্বব্যাপী বিচারব্যবস্থার কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে কূটনৈতিক যোগাযোগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠাবে। এর সঙ্গে থাকবে আদালতের আদেশ, মামলার বিবরণ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আইনগত ভিত্তি এবং অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণাদি। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক ইতিবাচক। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আমিরাতের আদালত।

বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তি নেই। এ কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, বেনজীরকে আদৌ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না। ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে ‘ট্রান্সফার অব সেন্টেন্সড প্রিজনার্স’ বা দ-প্রাপ্ত বন্দি বিনিময় চুক্তি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু বেনজীর আহমেদ এখনো কোনো মামলায় দ-িত নন। ফলে ওই বন্দিবিনিময় চুক্তি সরাসরি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

দুদকের আইনজীবী মাহমুদুল আরেফীন স্বপন বলেন, ‘বিদ্যমান চুক্তিটি কেবল সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। তাই বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে হলে অন্য আইনি পথ অনুসরণ করতে হবে।’

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের এক্সট্রাডিশন চুক্তি নাই। ভারতের ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে আছে। কিন্তু ওটা যে থাকতেই হবে, নট নেসেসারি। ওইটা থাকলে ইজি হইত। কিন্তু দুই দেশের সরকার পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই তাকে নিয়ে আসতে পারে।’

তিনি মনে করেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। তার ভাষায়, ‘অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২’-এর আওতায় সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ও ইউএইর সুসম্পর্ক এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনিরের মতে, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, শক্তিশালী ও নির্ভুল আইনি নথিপত্র। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ ও প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপন। তৃতীয়ত, ধারাবাহিক ও উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা।

তিনি বলেন, ‘ইউএইর আদালত প্রত্যর্পণ আবেদনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখবে। এর মধ্যে রয়েছে অভিযোগকৃত অপরাধ ইউএইর আইনেও অপরাধ কি না, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না এবং অভিযুক্ত বাংলাদেশে ফিরে ন্যায়সংগত বিচার পাবেন কি না।’

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেনজীর আহমেদ অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী নিয়োগ করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলতে পারেন। মানবাধিকার, বিচারিক নিরাপত্তা কিংবা কারাগারের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেও আদালতের কাছে সুরক্ষা চাইতে পারেন। এসব যুক্তি গ্রহণযোগ্য হলে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই ভুল ধারণা দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, রেড নোটিশ মানেই আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। রেড নোটিশ হলো কোনো পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত, খুঁজে বের করা এবং সাময়িকভাবে আটক রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা। এটি কোনো আদালতের চূড়ান্ত গ্রেপ্তারি আদেশ নয়। তবে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের বৈধ পরোয়ানা এবং শক্তিশালী অভিযোগ থাকলে রেড নোটিশ প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়াকে অনেক বেশি কার্যকর করে তোলে। বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক এক আইজিপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাবেক মন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশপ্রধান এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রত্যর্পণের বহু নজির রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় নিয়েছে। কখনো কয়েক মাস, কখনো কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা একাধিক আদালতে আপিল করে সময়ক্ষেপণ করেছেন। বাংলাদেশও অতীতে বিদেশ থেকে কয়েকজন আলোচিত আসামিকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। সাত খুন মামলার আসামি নুর হোসেন, রাজন হত্যা মামলার আসামি কামরুল এবং টিপু-প্রীতি হত্যা মামলার আসামি সুমন শিকদার ওরফে মুসাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদাহরণ রয়েছে। তবে সাবেক একজন আইজিপিকে ফিরিয়ে আনার মতো উচ্চ-প্রোফাইল বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রম।’

তার মতে, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি শুধু একজন সাবেক পুলিশপ্রধানের বিচার নয়। এটি বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানেরও বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা গেলে তা দেশের ভেতরে যেমন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরবে।

আরেক সাবেক আইজিপি বলেন, ‘আইনি প্রস্তুতি, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত কী ফল আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বেনজীর আহমেদকে ঘিরে বহুল আলোচিত এই প্রত্যর্পণ মিশনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ।’

বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার খুবই আন্তরিক মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে আইনি অনেক বিষয় আছে। ওই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের বিষয়টি জানিয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু বেনজীর যদি অন্য কোনো দেশের পাসপোর্টধারী হয়, সে ক্ষেত্রে তাকে ফিরিয়ে আনা এতটা সহজ হবে না। তবে আমরা তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছি।’