ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ড. দেবপ্রিয়

আর্থিক কাঠামোর দুর্বলতা ও প্রবৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:২০ এএম

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাজেট একদিকে আর্থিক কাঠামোগত দুর্বলতায় আক্রান্ত হয়েছে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির যে মডেল সামনে আনা হয়েছে তার যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের নীতিকাঠামোকে ‘চিন্তাশীল’ আখ্যা দিলেও এর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল বলেন তিনি।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘যে নীতিকাঠামো তৈরি হয়েছে বাজেটকে কেন্দ্র করে, সেটা মোটামুটিভাবে একটি চিন্তাশীল নীতিকাঠামো। কিন্তু এর পরেই সমস্যার সূত্রপাত। কারণ এই কাঠামোটি অত্যন্ত দুর্বল, সম্ভবত অকার্যকর আর্থিক কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয়েছে।’

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল সোমবার আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় তিনি এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এর আয়োজন করে। ব্রিফিং সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, অ্যাকশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান, কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়াসহ অনেকে। অনুষ্ঠানে আনসার ও পুলিশে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের নিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে অপূর্ণতা, অমনোযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘ছলচাতুরী’ করা হয়েছে। তথ্য নিয়ে ছলচাতুরী করলে সেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আগের সরকারও প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে বলা, মূল্যস্ফীতিকে কম দেখানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন না করার মতো কাজ করেছে।’ বর্তমান সরকারও যদি সেই পথে হাঁটে, তা হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক, বলেন তিনি।

বাজেট বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাজেট বাস্তবায়নে জনগণের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ ও নজরদারি প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটের অধিকাংশ প্রাক্কলন ৩০ জুন পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়নি। বরং গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রস্তুত করা তথ্যের ওপর নির্ভর করে মধ্যমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।’ ফলে আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সব প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা হালনাগাদ করার আহ্বান জানান তিনি।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘চলতি তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা হালনাগাদ না করলে আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাজারকে সঠিক সংকেত দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা তৈরি হবে। এতে সরকার নিজেই বিভ্রান্ত হতে পারে।’

২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পর পর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সংসদে বিবৃতি দেওয়ার বিধান পুনরায় কার্যকর করার আহ্বান জানান ড. দেবপ্রিয়। তার প্রত্যাশা, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্থমন্ত্রী প্রথম অর্থনৈতিক বিবৃতি উপস্থাপন করবেন। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিপিডির এই ফেলো। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বাজেটের হিসাব মেলাতে এক ধরনের কৃত্রিম রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পরে সেই বোঝা গিয়ে পড়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। এবারও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।’

তার মতে, প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, কর প্রশাসনের সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত না করে এনবিআরের ওপর অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে সরকারের সমন্বয়ের জায়গা কোথায় এ প্রশ্ন তুলে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ কমানো সম্ভব নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ভর্তুকি কমানোর পথই বেছে নেওয়া হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।’

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে হিজড়া ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা বাস্তবায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের সমাজের প্রতিনিধি রামিসা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু বাজেট বরাদ্দ দিলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে আনসার, পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে।’

রামিসা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সমাজেরই একটি অংশ। কিন্তু এখনো কর্মসংস্থান, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের শিকার হই। সবার আগে আমরা মানুষ। হিজড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, সম্মান ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন সম্ভব নয়।’

তৃতীয় লিঙ্গের এই প্রতিনিধি বলেন, ‘যোগ্যতার ভিত্তিতে আনসার, পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কিছু শর্ত শিথিল করার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম। তাই সরকারি ও বেসরকারি খাতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)-সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যার কারণে অনেক হিজড়া নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন। তাই এ বিষয়ে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।’