সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের প্রতিটি সীমান্ত সম্মেলনে বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদে সরকারি দলের মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির টেবিলে উত্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সব সময়ই সীমান্তে আত্মরক্ষার অজুহাতে ‘মারাত্মক বা প্রাণঘাতী অস্ত্র’ (লেথাল উইপন্স) ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে। যদিও বিএসএফের গুলিতে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদিত হয়নি, তবে প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ভারত সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো সংসদে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলাদেশের ক্রমাগত কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপের মুখে বিএসএফ সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে ‘নন-লেথাল উইপন্স’ বা অমরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, সীমান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।
মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে বদ্ধপরিকর : এদিকে সংসদে ঢাকা-১৬ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মো. আব্দুল বাতেনের টেবিলে উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে বদ্ধপরিকর। তিনি জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং কিশোর গ্যাং, চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানি থেকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক নিয়মিত কাউন্সেলিং, বিশেষ অভিযান এবং মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের নিয়মিত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। কিশোর গ্যাং যাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সক্রিয় হতে না পারে, সে লক্ষ্যে অনলাইন নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজের নেতাদের সম্পৃক্ত করে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক কারবারিদের শনাক্তকরণ এবং কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশের ৭৫ কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি : এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি আটক রয়েছে। কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের টেবিলে উত্থাপিত তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গত ৭ জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে সর্বমোট অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ (পুরুষ ৪৩ হাজার ১০৭ এবং মহিলা ২ হাজার ২৯) জনের বিপরীতে বর্তমানে ৭৬ হাজার ১১৩ জন (পুরুষ ৭৪ হাজার ৩৬ এবং মহিলা ২ হাজার ৭৭) জন বন্দি বা আটক আছে, যা ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি আটক থাকায় কিছু কিছু কারাগারে বন্দিদের আবাসন সমস্যা বিরাজ করছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরাণীগঞ্জ, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২, ফেনী জেলা কারাগার-২ এবং খুলনা জেলা কারাগার-২ চালু করা হয়েছে এবং কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২, মাদারীপুর জেলা কারাগার-২, পিরোজপুর জেলা কারাগার-২ শিগগির চালু করা হবে।
মন্ত্রী জানান, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, জামালপুর কারাগার পুনর্নির্মাণ এবং নরসিংদীতে নতুন কারাগারের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। উল্লিখিত ৪টি কারাগারের নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে বন্দি ধারণক্ষমতা আরও ২ হাজার ৯৫৫ জন বেড়ে সর্বমোট ৪৮ হাজার ৯১ জনে উন্নীত হবে। এ ছাড়া রাজশাহী, রংপুর, নোয়াখালী, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কারাগার পুনর্নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ধারণক্ষমতা আরও বাড়বে।

