প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের অর্থ কোনোভাবেই বিদেশে পাচার হতে দেওয়া হবে না; বরং সেই অর্থ জনগণের কল্যাণ, জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে ব্যয় করা হবে। তিনি বলেন, অনেকেই বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে প্রশ্ন তুলছেনÑ ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের অর্থ কোথা থেকে আসবে। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিগত এক যুগ ধরে জনগণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সরকার আর জনগণের অর্থ পাচার হতে দেবে না। জনগণের টাকা জনগণের জন্য, দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ব্যয় করা হবে। তাই অর্থের কোনো অভাব হবে না।
তিনি আরও বলেন, যারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে কিংবা এখনো জনগণের অর্থ বিদেশে পাঠাতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। সবাই সতর্ক থাকলে দেশের অর্থ আর কেউ বিদেশে পাচার করতে পারবে না। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই অর্থ দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে।
গতকাল বুধবার দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। পরে জাতীয় সংগীত ও বিএনপির দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১৫৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে ১০ জন নারীর হাতে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন এবং কম্পিউটারে বাটন চেপে ফ্যামিলি কার্ডের তৃতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষক, চা-শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। এবারের বাজেটে কৃষকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের ৪০ লাখ কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেওয়া হবে। একই সময়ে আরও ৪০ লাখ পরিবারের কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি জানান, দেশে প্রায় ৪ কোটি পরিবার রয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে সব পরিবারের কাছে, বিশেষ করে পরিবারপ্রধান নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক মাস আগে নির্বাচনি প্রচারণার সূচনা তিনি সিলেট থেকে করেছিলেন। সেদিন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে চা-বাগানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পেরে তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
তারেক রহমান বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় সব নারী চা-শ্রমিকের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চা-শ্রমিকদের আবাসন সমস্যার সমাধানে অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের উন্নয়নে সহযোগিতা না করলে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সরকার নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজকে শক্তিশালী করতে চায় এবং সেই লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দেশের সব মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এ দেশে একসঙ্গে বসবাস করছে। এই সম্প্রীতির ধারা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়ন করেছে। যারা এই জনকল্যাণমুখী বাজেটকে ‘চানাচুর’ বা ‘গণবিরোধী’ বলে আখ্যা দিচ্ছে, তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, এই বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে গ্রাম ও উপজেলার মানুষ সহজে স্বাস্থ্যসেবা পায়। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় শিল্প রক্ষায় বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সমজাতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যাতে স্থানীয় কারখানাগুলো সচল থাকে। স্থানীয় শিল্প সচল থাকলে বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার এই ব্যবস্থাগুলোও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিএনপিকে গণমানুষের দল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সব সময় জনগণের পাশে ছিল এবং জনগণই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। জনগণই সব ক্ষমতার উৎসÑ এই বিশ্বাস থেকেই বিএনপি রাজনীতি করে। যতবার জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ততবার বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছে।
বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের কঠিন সময়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা বিদেশে চলে গেলেও খালেদা জিয়া দেশ ছাড়েননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তার প্রথম ও শেষ ঠিকানা। তারেক রহমান বলেন, তারা খালেদা জিয়ার সৈনিক এবং বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে জনগণের প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আগামী পাঁচ বছর অব্যাহত রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে দেশের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব।
তিনি সবাইকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’Ñ এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পাশাপাশি চা-শ্রমিকদের আবাসন সুবিধার জন্য ৫০ জনকে ঘর নির্মাণে ২ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদানের উদ্যোগের কথা জানান। এ সময় মঞ্চে কয়েকজনের হাতে চেক তুলে দেওয়া হয় এবং বাকিদের কাছে প্রশাসনের মাধ্যমে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া চা-শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রায় ১৫০ জনকে বিশেষ বৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত পাঁচজনকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদানের চেক প্রদান করা হয়। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর পাঁচজনকে জীবনমান উন্নয়নের জন্য ১০ হাজার টাকা করে এককালীন আর্থিক সহায়তা, পাঁচজন শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষা অনুদান এবং দুস্থ, অসহায়, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও গৃহহীন ১০০ জনকে ১০ হাজার টাকা করে বিশেষ অনুদানের চেক দেওয়া হয়।
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম নয়ন (ময়ূন), মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস, উপকারভোগী শিউলী রানি দাস ও ওয়াজেদা বেগমসহ বিভিন্ন ব্যক্তি বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি জাম ও একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন।

