ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া

শেষ না হওয়া মহাকাব্য ‘মেসি’

ওমর ফারুক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৫:৩৩ এএম

কিছু কিছু রাত শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। কিছু কিছু ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কিছু কিছু গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায় না, বদলে দেয় মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি আর বিশ্বাসের মানচিত্র। কানসাস সিটির সেই রাত ছিল ঠিক তেমনই এক রাত, যে রাতে ফুটবল আবারও মনে করিয়ে দিল, কিংবদন্তিরা বয়সে বৃদ্ধ হন, কিন্তু মহত্ত্বে নয়। সেই কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। যার পায়ের জাদুতে গতকাল বুধবার আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, শুভ সূচনা করেছে বিশ^কাপ ২০২৬-এর মঞ্চে। একই সঙ্গে এই ম্যাচে হ্যাটট্রিকসহ বহু রেকর্ডের পাশে নিজের নাম বসিয়ে নিয়েছেন মেসি।

বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসিকে দেখে বিস্মিত হওয়ার কথা নয়। গত দুই দশক ধরে তিনি আমাদের বিস্ময়ের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। তবু এই ম্যাচের আগে প্রশ্ন ছিল, সংশয় ছিল, অপেক্ষা ছিল। কারণ বাস্তবতা বড় নির্মম। মানুষের শরীর সময়ের কাছে পরাজিত হয়। গতি কমে, পেশি ক্লান্ত হয়, প্রতিক্রিয়া শ্লথ হয়ে আসে। ৩৮ বছর বয়সে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে ষষ্ঠবারের মতো নামা একজন ফুটবলারের কাছে তাই প্রত্যাশার সঙ্গে সংশয়ও জুড়ে যায়।

ম্যাচের আগে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় ঘুরছিল একই প্রশ্ন, চোট থেকে তিনি পুরোপুরি সেরে উঠেছেন তো? শুরু থেকেই খেলবেন? খেললেও কি আগের মতো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন? নাকি তিনি এখন সেই বিরল কিংবদন্তিদের একজন, যাদের উপস্থিতি আবেগ জাগায়, কিন্তু খেলার গতিপথ বদলে দেয় না? প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই মেসি এসব প্রশ্নকে প্রায় উপহাসে পরিণত করলেন।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক বড় খেলোয়াড় এসেছেন। কেউ অসাধারণ গোল করেছেন, কেউ অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন, কেউ দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়েছেন। কিন্তু খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের উপস্থিতি পুরো একটি ম্যাচের আবহ বদলে দেয়। মেসি সেই বিরলদের একজন। মাঠে তিনি বল ছুঁয়ে কিছু করার আগেই দর্শকদের মনে এক ধরনের প্রত্যাশা জন্ম নেয়। মনে হয়, এখনই কিছু একটা ঘটবে। সেই অনুভূতিই ছিল কানসাস সিটির বাতাসে।

ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল, মেসি শুধুই মাঠে নামতে আসেননি, তিনি এসেছেন নিজের গল্পের নতুন অধ্যায় লিখতে। তাকে দেখা গেল মাঝমাঠে নেমে বল কাড়তে, প্রতিপক্ষকে তাড়া করতে, আক্রমণ শুরু করতে। কয়েক বছর ধরে আমরা যে মেসিকে দেখে অভ্যস্ত,  শক্তি সঞ্চয় করে খেলা, প্রয়োজনের মুহূর্তের জন্য নিজেকে ধরে রাখা, সেই মেসির সঙ্গে এই মেসির একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল। তিনি যেন আরও ক্ষুধার্ত। আর সেই ক্ষুধার প্রথম প্রকাশ ঘটে পঞ্চম মিনিটে। বল জালে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোল বাতিল। হতাশা ছিল, কিন্তু খুব বেশি নয়। কারণ যারা মেসিকে দীর্ঘদিন ধরে দেখেছে, তারা জানে, এমন রাতগুলোতে তিনি সাধারণত একবার নয়, বারবার ফিরে আসেন।

১৭ মিনিটে এলো সেই প্রত্যাবর্তন। রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে প্রায় চল্লিশ গজ দূরে বল পেয়েছিলেন তিনি। সামনে কিছুটা জায়গা। কয়েকটি দ্রুত স্পর্শ। তারপর বক্সের প্রান্ত থেকে নেওয়া শট। গোলরক্ষক লুকা জিদান হাত ছুঁয়েছিলেন, কিন্তু থামাতে পারেননি। বল জালে জড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হলো।

এটা শুধু একটি গোল ছিল না। ছিল এক অনুভূতির বিস্ফোরণ। কারণ দর্শকরা শুধু একজন খেলোয়াড়কে গোল করতে দেখেনি; তারা দেখেছে একটি যুগকে আবারও নিজের শক্তির প্রমাণ দিতে। হয়তো সেই মুহূর্তে অনেকের মনে ফিরে এসেছে কাতার, রাশিয়া, ব্রাজিল কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার স্মৃতি। ফিরে এসেছে বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পে কাটানো অসংখ্য রাত। ফিরে এসেছে সেই তরুণ ছেলেটি, যে একসময় পৃথিবীকে শিখিয়েছিল অসম্ভবকে কীভাবে সম্ভব করতে হয়।

প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনা যেন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। মাঝমাঠে দি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজ খেলার নিয়ন্ত্রণ নিলেন। রক্ষণভাগ ছিল সংগঠিত। আক্রমণভাগ ছিল সচল। আর এই পুরো কাঠামোর কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য পরিচালক। দ্বিতীয় গোলটি ছিল অভিজ্ঞতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ঘড়ির কাঁটা যখন ৬০ মিনিট ছুঁয়েছে, তখন ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি দূরপাল্লার শট গোলরক্ষক ঠেকালেও বল ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। অধিকাংশ খেলোয়াড় হয়তো তখনো পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু মেসি বুঝেছিলেন। কারণ মহাতারকারা শুধু সুযোগ সৃষ্টি করেন না, তারা সুযোগের গন্ধও পান। সবার আগে বলের কাছে পৌঁছে তিনি জালে পাঠালেন। গোলরক্ষকের ভুলকে ইতিহাসের অংশ বানিয়ে দিলেন।

দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও তার চোখে তৃপ্তি ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, তিনি আরও কিছু খুঁজছেন। হয়তো ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে ‘পারফেক্ট নাইট’।

সেই রাতের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি লেখা হলো ৭৬ মিনিটে। বল পেয়েছিলেন বক্সের বাইরে। সামনে তিনজন ডিফেন্ডার। সাধারণ ফুটবলাররা হয়তো পাশ খুঁজতেন। অসাধারণ ফুটবলাররা হয়তো জায়গা তৈরি করতেন। কিন্তু মেসি যা করলেন, তা শুধু মেসির পক্ষেই সম্ভব।

ডিফেন্ডারদের মাঝখান দিয়ে নিচু শট। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। তারপর বল জালে। তারপর বিস্ফোরণ। তারও পর ইতিহাস। হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে, ৩৮ বছর বয়সে এসে এত দুর্দান্ত পরফরম্যান্স। এ যেন কোনো চিত্রনাট্যকারের লেখা গল্প নয়,  বাস্তবের চেয়ে সুন্দর এক বাস্তবতা।

এই হ্যাটট্রিকের পর পরিসংখ্যানের বই নতুন করে খুলতে হয়েছে। বিশ্বকাপে ১৬ গোল করে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন তিনি। মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই গড়েছেন ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার অভূতপূর্ব রেকর্ড। নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচকে রূপ দিয়েছেন এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিতে।

কিন্তু মেসির গল্প কখনোই শুধু সংখ্যার গল্প নয়। তার প্রকৃত মহত্ত্ব লুকিয়ে থাকে সংখ্যার বাইরে। গোল, অ্যাসিস্ট, ট্রফি, রেকর্ড, এসব দিয়ে তার অর্জনের হিসাব করা যায়। কিন্তু একজন মানুষের কল্পনাশক্তিকে কতবার নাড়া দিয়েছেন, কত শিশুকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছেন, কত মানুষকে আনন্দে কাঁদিয়েছেন, সেই হিসাব করার কোনো উপায় নেই। এই আর্জেন্টিনা দলটির বিশেষত্ব যেন এখানেই।

লিওনেল স্কালোনির দল জানে কীভাবে জিততে হয়। কীভাবে চাপ সামলাতে হয়। আর কীভাবে নিজেদের তারকাকে সুরক্ষা দিতে হয়। ম্যাচের ৮০ মিনিটে যখন তাকে তুলে নেওয়া হলো, পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে গেল। সত্তর হাজার মানুষের করতালি ধ্বনিত হচ্ছিল রাতের আকাশে। সেখানে প্রতিপক্ষের সমর্থকরাও ছিল। নিরপেক্ষ দর্শকরাও ছিল। সবাই জানত, তারা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী।

এটি শুধু একজন ফুটবলারের মাঠ ছাড়ার দৃশ্য ছিল না। এটি ছিল একটি যুগকে সম্মান জানানোর মুহূর্ত। মেসি ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। মুখে পরিচিত সেই শান্ত অভিব্যক্তি। কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। যেন সব কিছুই স্বাভাবিক। যেন তিনি জানেন, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোও তার কাছে কখনো কখনো সহজ মনে হয়। হয়তো এ কারণেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। কারণ তিনি শুধু গোল করেন না, স্মৃতি তৈরি করেন। তিনি শুধু ম্যাচ জেতান না, প্রজন্ম তৈরি করেন। তিনি শুধু ইতিহাস লেখেন না, ইতিহাসের সংজ্ঞাই বদলে দেন।

কানসাস সিটির সেই মাঠে মহাকালের পদচিহ্ন রেখে মেসি ফুটবল বিশ^কে আবারও মনে করিয়ে দিলেন, কিছু সিংহাসন এত সহজে খালি হয় না।

সেই কারণেই, ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম রাত শেষে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আবারও এক সত্যের সামনে দাঁড়াল, কিংবদন্তিরা কখনো বিদায় নেন না, তারা ফিরে আসেন নতুন ইতিহাস হয়ে।

রেকর্ডের বরপুত্র মেসি তার পঞ্চম বিশ^কাপের শুরুতেই গতকাল বিভিন্ন রেকর্ডের খাতায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়েছেন। সেসব রেকর্ড তার স্থানকে নিয়ে গেছে আরও উচ্চতায়। জেনে নেওয়া যাক মেসির নতুন গড়া সেসব রেকর্ড।

বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা : এই ৩ গোলে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬। কিলিয়ান এমবাপ্পে, গার্ড মুলার ও রোনালদো নাজারিওকে ছাড়িয়ে তিনি এখন মিরোস্লাভ ক্লোসার সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা।

বয়স্কতম হ্যাটট্রিকধারী : ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর (৩৩ বছর ১৩০ দিন) রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়সি ফুটবলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়লেন মেসি। (৩৮ বছর ৩৫৭ দিন)

পাঁচ বিশ্বকাপে গোল : ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং চলতি ২০২৬, পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ডে রোনালদোর পাশে বসলেন তিনি।

প্রবীণতম স্কোরার : বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সি গোলদাতার তালিকায় মেসি এখন রজার মিলার ও পেপের পর ৩ নম্বরে।