ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

মানবতাবিরোধী অপরাধ

ইনুর মামলার রায় ৩০ জুন

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৫:০১ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর মামলার রায় জানা যাবে ৩০ জুন। গতকাল সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দিন ঠিক করে দেন। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও ফারুক আহাম্মদ।

প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মূলত চার্জ হচ্ছে যে, তিনি সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটিতে তার যে দায়িত্ব ছিল, তিনি শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করা, বিভিন্ন পলিসি সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং তাদের এই বিভিন্ন রকমের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়াসহ সারা বাংলাদেশে অনেক হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে, সেটার দায় তার উপরে বর্তায়।’

তিনি বলেন, ‘১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছি... হাসানুল হক ইনু সাহেবের যে সংশ্লিষ্টতা, সাক্ষীরা তা প্রমাণ করেছেন কোর্টে। উভয় পক্ষের আর্গুমেন্ট হয়েছে। এটি জাজমেন্টের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। আজকে সেটার তারিখ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। রায় নিয়ে প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা হলোÑ আইন অনুযায়ী তার যে অপরাধ, সে অনুযায়ী তার যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়Ñ সেটাই প্রত্যাশা করছি।

বিচার-প্রশাসন কে কী করছে লাল ও সবুজ খাতায় লিখে রাখছি : আদালতকে ইনু : এদিকে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু লাল ও সবুজ রঙা দুটি খাতা সংরক্ষণ করেছেন, তাতে বিচার, প্রশাসনের কে কি করছে তা লিখে রাখছেন বলে জানিয়েছেন আদালতকে। জুলাই আন্দোলনের সময় মো. মোখলেছিন নামে এক ব্যক্তিকে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর শুনানিতে গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে এ কথা বলেন ইনু।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার এসআই আশরাফ হোসেন ১৮ জুন ইনু ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে শুনানির দিন রাখেন সোমবার। এদিন শুনানিকালে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে ১টা ৫০ মিনিটের দিকে এজলাসে তোলা হয় তাদের। রাখা হয় আসামির কাঠগড়ায়।

তাদের কেন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে আদালতের কাছে তা তুলে ধরেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর মেনন ও ইনুর আইনজীবীরা দাবি করেন, তারা ঘটনার সাথে জড়িত না। বয়স্ক, অসুস্থ বিবেচনায় তাদের গ্রেপ্তার না দেখানোর প্রার্থনা করেন তারা। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ আসামিদের গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর তারা। হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করার সবই করেছিলেন। তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী, এমপিও ছিলেন। এমন কোনো অন্যায় নাই যে করেননি। তাদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রার্থনা করছি। এরপর আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চান ইনু। অনুমতি পেয়ে তিনি বলেন, ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পর তদন্ত কর্মকর্তা আবিষ্কার করলেন, আমি এই ঘটনার সাথে জড়িত। আমাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করলেন।

তদন্ত কর্মকর্তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ইনু বলেন, তিনি তার দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। এত দিনেও মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেননি। নিজেকে ‘সংকটাপন্ন হৃদরোগের রোগী’ বর্ণনা করে ইনু বলেন, আমার ডায়াবেটিসও রয়েছে। সকালে আমাদের নিয়ে আসা হয়। সাড়ে চার ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। এতে আমি আমার জীবন বিপন্নের আশঙ্কা করছি। যেকোনো সময় বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আদালতের অবহেলার কারণে এত দীর্ঘ সময় হাজতখানায় বসে থাকতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ। তখন তাকে ধমক দিয়ে ইনু বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলছি। আপনার সাথে না। বিচারক দুজনকেই শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারপর আবার কথা বলা শুরু করেন ইনু। তিনি বলেন, ড. ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে বলেছিল গণতন্ত্রের সুবাতাস বইছে। সেই সুবাতাস আদালত পাড়ায় আসেনি। আদালত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা শাখা হিসেবে কাজ করছে। আপনার মাধ্যমে (বিচারক) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব, তিনি অনেক জায়গায় গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আদালতপাড়ায় এখনো গণতন্ত্র আসেনি। ইনুর এমন বক্তব্যে আপত্তি তোলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তাকে ধমকের সুরে ইনু বলেন, আমি তো আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলছি। আপনার সাথে বলছি না।

এ পর্যায়ে ইনু বলেন, আমি যেখানে (কারাগারে) আছি, জেলখানায় আছি। একটা সবুজ খাতা ও একটা লাল খাতা তৈরি করেছি। সেখানে আমি ২২ মাস ধরে আদালতের কোন কর্মকর্তা, কর্মচারি কি করছে, প্রশাসনের কে কি করেছে, কোন কর্তৃপক্ষ কি করছে তা লিপিবদ্ধ করেছি। আদালত আমাদের সাড়ে চার ঘণ্টা হাজতখানায় বসিয়ে রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি করেছে। আমার জীবন বিপন্ন করেছে। অনেক ধন্যবাদ, আমার বক্তব্য ধৈর্য ধরে শোনার জন্য। ইনুর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান হারুন অর রশীদ। তিনি আদালতকে বলেন, তার এ বক্তব্য আদালত অবমাননার শামিল। লাল খাতা ও সবুজ খাতার কথা বলে আদালতকে হুমকি দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রার্থনা করছি। উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত তাদের ইনু ও রাশেদকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।