চীন সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব পিপল’-এ বৈঠকটি হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। এ সময় শুভেচ্ছা বিনিময় ও দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয়পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকশ দল। এ সময় দুদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এ বৈঠক হয়। বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। বিকেলে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাগত জানান।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বৈদেশিক সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য চীন। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীন সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও চুক্তি স্মারক সই হয়। এসব চুক্তির মধ্যে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্প গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশ পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে এবং ২০২৪ সালে এই সম্পর্ককে সর্বাত্মক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বে উন্নীত করা হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীন টানা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে রয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আঞ্চলিক পর্যায়েও দুই দেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা করে আসছে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতেও দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ছিলেনÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। বৈঠকের পরে গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করেন লি কিয়াং। সেখানে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন বিলাসবহুল জীবন থেকে দূরে থাকতেন, যা তাকে ‘মাটির মানুষ’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিল। তার প্রতিদিনের চলাফেরা, খাবার ও পোশাকে পরিমিতিবোধ এবং নিয়মানুবর্তিতা ছিল লক্ষণীয়, যা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে বড় উদাহরণ বলে দেশের রাজনীতিতে আজও আলোচনা হচ্ছে। তিনি সরাসরি মানুষের সমস্যা শুনতেন এবং তাদের সঙ্গে মিশে যেতেন, যা জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যেও বাবার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। তার সাদাসিধে চলাফেরা এরই মধ্যে জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ ও চীনের ১৩ সমঝোতা : স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক বিষয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ১৩টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিংয়ের মধ্যে রয়েছেÑ ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কীভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যানের বিষয়ে কথা হয়েছে। বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রপ্তানি করতে পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কীভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারিÑ সেটি নিয়ে কথা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক এলাইনমেন্ট রিলেটেড ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমইউ হয়েছে। একই সঙ্গে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটা ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের রপ্তানি বিষয়ে একটা এমইউ হয়েছে।’
চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন আচরণ ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা পাবেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ শীর্ষক এক কনফারেন্সে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। পাঁচ দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন তিনি।
কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীন বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠছে। উন্নত উৎপাদন, উচ্চ-মূল্যের অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, চীনের ক্রমবর্ধমান বড় অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বৈশ্বিক বাজারে তাদের পরিষেবার মাধ্যমে দুই দেশই সমানভাবে লাভবান হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের আশ^স্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, দেশের প্রচলিত আইন ও প্রবিধান অনুযায়ী শতভাগ মূলধন এবং লভ্যাংশ ফেরত নিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে বাংলাদেশে। চীনা বিনিয়োগকারীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে ইতোমধ্যে বিশেষায়িত শিল্প অবতরণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ এবং মংলায় একটি দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ (ইনভেস্টমেন্ট অফিস) খোলার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য আর বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। যোগাযোগ ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর ও সহজ করতে তার সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং চীনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে চীনের শীর্ষস্থানীয় উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন