× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৭:০১ এএম

ছোট দলের বড় প্রাচীর

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৭:০১ এএম

ছোট দলের বড় প্রাচীর

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনা, পরাশক্তিদের দাপট ও তারকাখচিত দলগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের রণক্ষেত্র। তবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উপাখ্যানগুলো কখনোই কেবল বিজয়ীদের ড্রয়িংরুমে রচিত হয় না; বরং তা লেখা হয় প্রান্তিক ও অনগ্রসর ফুটবল শক্তির অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের রূপকথায়। চলতি বিশ্বকাপে তেমনই অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছে, যেখানে তথাকথিত ছোট দলগুলো তাদের গোলপোস্টের নিচে দাঁড় করিয়েছিল চীনের প্রাচীরের চেয়েও দুর্ভেদ্য কিছু মানব-দুর্গ। পরাশক্তিদের একের পর এক আক্রমণের সুনামি যেভাবে বুক পেতে থমকে দিয়েছেন এই গোলরক্ষকরা, তা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কুরাসাও, কেপ ভার্দে কিংবা ইরানের মতো দলগুলোর এই বীরোচিত লড়াই প্রমাণ করেছে, ফুটবল কেবল মাঠের শক্তিমত্তার খেলা নয়, এটি বুকভরা সাহস আর অদম্য আত্মবিশ্বাসেরও মহাকাব্য।

কুরাসাওয়ের মহাকাব্য

মাত্র দেড় লাখ জনসংখ্যার এক দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। বিশ্ব মানচিত্রে যাদের খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়, তারা যখন বিশ্বমঞ্চে লাতিন আমেরিকার ডার্ক হর্স ইকুয়েডরের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন বোদ্ধাদের অনুমান ছিল স্রেফ সময়ের ব্যবধান। কারণ, এর আগের ম্যাচেই জার্মানির কাছে ৭ গোল হজম করে বিধ্বস্ত হয়েছিল দলটি। কিন্তু ক্যানসাস সিটির মাঠে যা ঘটল, তাকে অলৌকিক বললেও কম বলা হয়। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে যখন কুরাসাওয়ের ৩৭ বছর বয়সি গোলরক্ষক ইলয় রুম হাঁটু গেড়ে মাটিতে মাথা নুইয়ে দিলেন, তখন সেই দৃশ্যে মিশে ছিল চরম তৃপ্তি। বিশ্বজয়ের সমান আনন্দে মেতে উঠেছিল গোটা দল। ইকুয়েডরের একের পর এক আক্রমণ যেভাবে নস্যাৎ করেছেন রুম, তা ছিল অবিশ্বাস্য। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ইকুয়েডরের ১৫টি নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা একাই নসাৎ করে দেন রুম। ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ডের ১৬টি সেভের রেকর্ড থাকলেও, তা ছিল অতিরিক্ত সময়সহ। ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের হিসেবে ইলয় রুমের এই ১৫টি সেভ এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসের অবিসংবাদিত চূড়া।  ইকুয়েডরকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রেখে কুরাসাও কেবল একটি পয়েন্ট পায়নি, পেয়েছে এক টুকরো অনন্ত ইতিহাস। একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেশের বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের এই গল্প বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল অনুপ্রেরণার নাম হয়ে থাকবে।

কেপ ভার্দের স্বপ্নযাত্রা

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কেপ ভার্দে নামটি এবারই প্রথম উচ্চারিত হয়েছে গভীর সম্ভ্রমে। প্রথম ম্যাচেই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দিয়ে যে চমকের শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকল উরুগুয়ের বিপক্ষেও। আর এই রূপকথার প্রধান কারিগর ৪০ বছর বয়সি অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে আটটি দুর্দান্ত সেভ করে যিনি রাতারাতি তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন, তিনি উরুগুয়ের বিশ্বখ্যাত আক্রমণভাগের সামনেও হয়ে উঠলেন দুর্ভেদ্য দেয়াল। মায়ামির স্টেডিয়ামে যখন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে একাধিক শিরোপাজয়ী ফেদেরিকো ভালভার্দের নাম ঘোষকের মাইকে উচ্চারিত হচ্ছিল, তার চেয়েও বহুগুণ জোরালো চিৎকার আর উল্লাস ধ্বনিত হয়েছিল ভোজিনিয়ার নাম পর্দায় ভেসে ওঠার পর।

উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল স্নায়ুক্ষয়ী যুদ্ধ। মায়ামির গ্যালারিতে উপস্থিত ভোজিনিয়ার মা অ্যানা ক্যান্ডিডা ইভোরা ও তার পরিবারের সামনেই রচিত হলো ২-২ গোলের ড্রয়ের রোমাঞ্চকর নাটক। ম্যাচের ৬৮ মিনিটে যখন উরুগুয়ের ম্যাক্সি আরাউজোর শট জালে জড়ানোর উপক্রম হয়েছিল, তখন অফসাইডের পতাকায় মাঠের সমর্থকেরা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পান। ম্যাচের বাকিটা সময় গ্যালারিজুড়ে শুধু প্রতিধ্বনিত হয়েছে ভোজিনিয়ার নাম। ম্যাচ শেষে এই অভিজ্ঞ গোলকিপার শান্ত কণ্ঠে বলেন, এটা আমাদের কাছে এবং কেপ ভার্দের বাসিন্দাদের জন্য স্বপ্ন সত্যি হওয়ার বিষয়। টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সম্মান আদায় করাটা আনন্দের। তারকাখ্যাতির জোয়ারে ভেসে গিয়েও ভোজিনিয়া ভোলেননি তার শিকড়কে, বন্ধুদের শুভেচ্ছা বার্তার জবাব দিতে দিতেই তার দিন কাটছে। কেপ ভার্দের এই লড়াকু মানসিকতা প্রমাণ করে, ফুটবল মাঠে ঐতিহ্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে লড়াকু মনোভাব।

ইরানি মহাপ্রাচীর

লস অ্যাঞ্জেলেসে জি গ্রুপের লড়াইয়ে বেলজিয়াম বনাম ইরানের ম্যাচটি ছিল আপাতদৃষ্টিতে ডেভিড বনাম গোলিয়াতের লড়াই। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে থাকা, একঝাঁক ইউরোপীয় তারকা সমৃদ্ধ বেলজিয়াম যখন মাঠে নামে, তখন তাদের আক্রমণভাগে ছিলেন ইডেন হ্যাজার্ড, রোমেলু লুকাকু ও কেভিন ডি ব্রুইনের মতো বিশ্বসেরা তারকারা। অন্যদিকে, রক্ষণভাগে ছিলেন জ্যা ভার্টনঘেন আর ভিনসেন্ট কোম্পানির মতো স্তম্ভ। কিন্তু মাঠের সব জৌলুস একাই ম্লান করে দিলেন ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার ইরানি গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। বেলজিয়ামের রেড ডেভিলরা পুরো ম্যাচে ইরানের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে ২২টি শট নিয়েছিল, যার মধ্যে অন্তত সাতটি ছিল নিশ্চিত গোলের সুযোগ। কিন্তু বেইরানভান্দ যেন ইরানের পোস্টের সামনেচীনের মহাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাইটন মিডফিল্ডার ম্যাক্সিম ডি কুইপারের দুটি জোরালো শট যেভাবে বেইরানভান্দ প্রতিহত করেন, তা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বেলজিয়াম শিবির। অন্যদিকে ইরানের ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর বেলজিয়াম গোলরক্ষক থিবো কর্তুয়াও নিজের দক্ষতা দেখান, যার ফলে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়। তবে এই ড্রয়ের মহিমা ইরানের কাছে জয়ের চেয়েও অনেক বেশি।  স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঘরের মাঠে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে ঘরোয়া লিগ বন্ধ থাকা, সব মিলিয়ে সম্ভাব্য সবচেয়ে বাজে প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছিল ইরান।

কোনো প্রীতি ম্যাচ খেলার সুযোগও তারা পায়নি। সেই প্রতিকূলতা জয় করে টানা দুই ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়ে মাঠ ছাড়ল এশিয়ান পরাশক্তিরা। কোচ আমির ঘালেনোই গর্ব করে বললেন, এই ফুটবলাররা আমাদের জাতীয় বীর হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন ভোরের আহ্বান

ফুটবল বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি কেবল বড় বড় ক্লাবের কোটি টাকার তারকাদের একক আধিপত্যের মঞ্চ নয়। এটি কুরাসাওয়ের ইলয় রুম, কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া কিংবা ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দের মতো যোদ্ধাদেরও মঞ্চ, যারা নিজেদের জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের দেশের সম্মান অক্ষুণœ রাখেন। তারা যখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ান, তখন তাদের পেছনে শুধু একটি জাল থাকে না, থাকে একটি দেশের কোটি মানুষের আবেগ, আশা আর স্বপ্ন। চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচগুলো ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে শিক্ষা দিল। বড় নাম, বড় বাজেট কিংবা অতীত ঐতিহ্যই শেষ কথা নয়; মাঠের ৯০ মিনিটে যদি এক জোড়া বিশ্বস্ত হাত আর ইস্পাতকঠিন মনোবল থাকে, তবে যে কোনো পরাশক্তিকেই রুখে দেওয়া সম্ভব। ছোট দলগুলোর এই বড় প্রাচীর হয়ে ওঠার গল্প ফুটবলের চিরন্তন সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করল, যেখানে ট্রফি না জিতেও একেকজন গোলরক্ষক হয়ে উঠলেন কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ের চ্যাম্পিয়ন।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!