বাংলাদেশে এখন আর শুধু ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা দাবার প্রতিযোগিতা হয় না। নীরবে-নিভৃতে আরও একটি প্রতিযোগিতা বহু বছর ধরে চলছে। নাম- ‘তদন্ত প্রিমিয়ার লিগ’ (টিপিএল)। এখানে কোনো ব্যাট-বল নেই, নেই বাঁশির শব্দ, নেই রেফারি। আছে শুধু একটি ক্যালেন্ডার, কিছু মোটা ফাইল, আদালতের একটি নির্ধারিত তারিখ এবং বহুল পরিচিত একটি বাক্য, ‘তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হলো।’ সাম্প্রতিক স্কোরবার্ড বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বেড়েছে ৯৬ বার। তবে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই এখন দুটি হেভিওয়েট দলের মধ্যে।
একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলা- তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বী। এরই মধ্যে ৯৬-এ পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে সাগর-রুনি হত্যা মামলা- অভিজ্ঞ, প্রবীণ ও রেকর্ডধারী। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে ১২৭ বার।
দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেও নাকি তুমুল আলোচনা। এক পক্ষের দাবি, ‘১২৭-এর রেকর্ড সহজে ভাঙা যাবে না।’ ওরাও এগোতে থাকবে। অন্য পক্ষের আত্মবিশ্বাস, ‘ধৈর্য ধরুন। মৌসুম এখনো অনেক বাকি!’ ক্রীড়া বিশ্লেষকেরাও হিসাব কষছেন। ‘বর্তমান রানরেট যদি ঠিক থাকে, তাহলে আগামী কয়েক মৌসুমেই নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতে পারে!’
ধারাভাষ্যকার উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন- ‘প্রিয় দর্শক, অবিশ্বাস্য! রিজার্ভ চুরি মামলা দ্রুত এগিয়ে আসছে। ব্যবধান এখন মাত্র ৩১। স্কোরবোর্ডে চোখ রাখুন। ইতিহাস কি বদলে যাবে?’
মাঝে মাঝে মনে হয়, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নয়, যেন পয়েন্ট টেবিল প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রথম স্থান- ১২৭। দ্বিতীয় স্থান- ৯৬। তৃতীয় স্থান... এখনো খোঁজা হচ্ছে।
যদি কোনো দিন সত্যিই ‘তদন্ত প্রিমিয়ার লিগ’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান হয়, তাহলে হয়তো সঞ্চালক প্রশ্ন করবেন- ‘আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- শেষ পর্যন্ত কে জিতবে?’
হলভর্তি নীরবতা। তারপর পেছনের সারি থেকে একজন সাধারণ নাগরিক উঠে দাঁড়িয়ে বলবেন- ‘স্যার, এই খেলায় কেউ জিতলে আসলে আমরা সবাই হেরে যাই।’ কারণ, ১২৭ কিংবা ৯৬- দুটোই কোনো অর্জনের সংখ্যা নয়; এগুলো বিচারপ্রত্যাশী মানুষের অপেক্ষার দিনপঞ্জির সংখ্যা। এই প্রতিযোগিতার ট্রফি কারও হাতে না উঠলেই বরং দেশের জয়।
যেদিন স্কোরবোর্ড আর বাড়বে না, সেদিনই হবে সত্যিকারের ফাইনাল। সেদিন চ্যাম্পিয়ন হবে না কোনো মামলা। চ্যাম্পিয়ন হবে জবাবদিহি, কার্যকর তদন্ত ও মানুষের আস্থা।
ক্রিকেটের ভাষায় বলা যায়- উইকেট হাতে আছে, ওভারও বাকি। ম্যাচ এখনো শেষ হয়নি!
ভাবুন তো, যদি কোনো টেলিভিশন চ্যানেল এই প্রতিযোগিতার সরাসরি ধারাভাষ্য করত! ‘স্বাগত, প্রিয় দর্শক। আজকের হাইলাইটস- রিজার্ভ চুরি মামলা আবারও এক ধাপ এগোল। স্কোর এখন ৯৬। দর্শকের মধ্যে উত্তেজনা- চলতি মৌসুমেই কি তিন অঙ্ক স্পর্শ করবে? অন্যদিকে অভিজ্ঞ প্রতিযোগী সাগর-রুনি মামলা ১২৭ নিয়ে এখনো নিরাপদ দূরত্বে।’
গ্যালারিতে দর্শকদের ব্যানার- ‘তারিখ বাড়াও, ইতিহাস গড়ো!’ কেউ আবার ঢাক বাজিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন- ‘আরেকটা তারিখ চাই!’ এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এখানে কেউ হারতে চায় না, আবার জিততেও চায় না। কিন্তু স্কোরবোর্ড তবু আপনা-আপনিই বড় হতে থাকে। একসময় মনে হয়, তদন্তের চেয়ে ‘পরবর্তী তারিখ’ই যেন মূল নায়ক। আদালতের ক্যালেন্ডারের পাতাগুলোও বোধ হয় এখন একটু ভয় পায়। নতুন মাস এলেই তারা ভাবে, ‘আহা, এবার আবার কার পালা?’
২০১৬ সালে রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি হয়েছিল। তখন যে শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যিনি প্রথম চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তিনি হয়তো এখন বিভাগীয় প্রধান। কারো বিয়ে হয়েছে, কারো সন্তান স্কুলে যাচ্ছে। পৃথিবী বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, ব্যাংকিং নিরাপত্তা বদলেছে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও মানুষের সঙ্গে গল্প লিখছে। সাগর-রুনির শিশুসন্তান মেঘও এখন অনেক বড়। শুধু তদন্তের ক্যালেন্ডারটি যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে পাতা উল্টে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে ‘চূড়ান্ত পর্যায়’ শব্দটিরও বোধ হয় একটি আলাদা জীবন আছে। অনেকেই ভাবেন, চূড়ান্ত মানেই শেষ। কিন্তু তদন্তের অভিধানে ‘চূড়ান্ত পর্যায়’ সম্ভবত একটি আরামদায়ক অপেক্ষাকক্ষ, যেখানে বসে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া যায়। ‘অগ্রগতি হয়েছে।’ ‘তদন্ত চলছে।’ ‘গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’- এই তিনটি বাক্য এমন জনপ্রিয় যে, চাইলে এগুলো দিয়ে একটি অনুপ্রেরণামূলক ক্যালেন্ডার ছাপানো যেতে পারে। প্রতি মাসে একটি করে উদ্ধৃতি। জানুয়ারি- ‘তদন্ত চলছে।’ ফেব্রুয়ারি- ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’ মার্চ- ‘খুব শিগগিরই আসামি গ্রেপ্তার হবে, চার্জশিটও হবে ।’... ডিসেম্বরে এসে আবার- ‘পরবর্তী তারিখ।’
ভাবতে অবাক লাগে, যে অর্থ চুরি হতে লেগেছিল কয়েক ঘণ্টা, দুজনকে খুন করতে বড়জোর কয়েক মিনিট- সেই সব ঘটনার তদন্ত চলছে এক-দুই দশক সময় ধরে। খুনি-চোরদের গতি ছিল ব্রডব্যান্ড। তদন্তের গতি যেন ডাকপিয়নের বাইসাইকেল।
কেউ কেউ বলেন, তদন্ত একটি জটিল বিষয়। নিশ্চয়ই তাই। কিন্তু সাধারণ মানুষেরও একটি সহজ প্রশ্ন থাকে- জটিলতারও কি কোনো শেষ তারিখ থাকে না? এখন কল্পনা করুন, যদি ‘তদন্ত প্রিমিয়ার লিগ’-এর জন্য পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হতো। উপস্থাপক ঘোষণা দিচ্ছেন- “এ বছরের ‘সেরা সময় বৃদ্ধি’ পুরস্কার যাচ্ছে...”- দর্শক নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন। এরপর মঞ্চে একটি বিশাল ক্যালেন্ডার আনা হলো। ফাইলের আকৃতির একটি ট্রফি। আর পেছনে বাজছে গান ‘চলবে... চলবে... চলবে...।’ গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের কর্মকর্তারাও নাকি আগ্রহী। তবে তারা রেকর্ডটি কী নামে নথিভুক্ত করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায়।
এদিকে আদালতের বেঞ্চে রাখা ক্যালেন্ডারটিরও হয়তো আলাদা আত্মজীবনী লেখা উচিত। নাম হতে পারে- ‘আমি এবং আমার পরবর্তী তারিখসমূহ’। একেকটি পাতা ওল্টায়, একেকটি ঋতু বদলায়, কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট মামলার পাশে একই বাক্য রয়ে যায়। একদিন হয়তো প্রত্নত্বত্ত্ব অধিদপ্তর পুরোনো আদালতের ফাইল খুঁড়ে বলবে- ‘দেখুন! এখানে ২০২৬ সালের একটি আদেশ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন তারিখ ধার্য করা হয়েছে!’ গবেষকেরা সেটিকে সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করবেন।
আমরা মনে রাখি না যে, প্রতিটি ‘সময় বৃদ্ধি’ কেবল একটি নতুন তারিখ নয়; এটি অপেক্ষারত মানুষের ক্যালেন্ডারে আরও একটি পাতা ঝরে পড়ার গল্প। রিজার্ভ চুরির অর্থ শুধু টাকা নয়, রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও বহন করে। সাগর-রুনি হত্যা মামলা শুধু একটি অপরাধের তদন্ত নয়, ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষার প্রতীকও। তাই এই ‘প্রতিযোগিতা’ আসলে এমন একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে নতুন রেকর্ড মানে নতুন আনন্দ নয়, বরং আরও দীর্ঘ অপেক্ষা। হয়তো একদিন সত্যিই স্কোরবোর্ড থেমে যাবে। সেদিন কোনো দল জিতবে না, কোনো ট্রফি উঠবে না। জিতবে শুধু একটি জিনিস- সময়মতো সম্পন্ন হওয়া তদন্তের প্রতি মানুষের আস্থা। সেদিন ‘পরবর্তী তারিখ’ নয়, সংবাদ শিরোনাম হবে- ‘অবশেষে তদন্ত প্রতিবেদন জমা।’ সত্যি বলতে, এই একটি শিরোনামের জন্যই দেশ অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন