ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজার সাত দিনব্যাপী দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ উপলক্ষে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, শোকসভা ও শোকমিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, দেড় থেকে ২ কোটি মানুষ সপ্তাহব্যাপী এই শোক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন।
গত মার্চে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা পিছিয়ে দেওয়া হয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধি, অন্তত আটজন সরকারপ্রধান, ১২টি দেশের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশেষ দূত জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি ইউরোপীয় দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে খামেনির ছেলে মুজতাবা খামেনি তার বাবার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন না বলেই জানিয়েছেন ভারতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহি।
তিনি বলেন, মুজতাবা খামেনি ব্যক্তিগতভাবে বাবার জানাজায় যাওয়া এবং শোকার্ত মানুষের মাঝে শামিল হতে চাইলেও তার নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় সেই সম্ভাবনা খুবই কম।
এলাহি আরও জানান, মুজতাবা খামেনির ঘনিষ্ঠজনেরা এই আভাস দিয়েছেন যে, তিনি বাইরে বেরোতে চান এবং সমর্থকদের সঙ্গেও দেখা করতে চান। কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাকে সেটি না করারই পরামর্শ দিয়েছে।
তিনি বলেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের এই সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা এখনো অনেক বেশি। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, সময় খুবই বিপজ্জনক। মুজতাবাকে তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
গতকাল তেহরানে শুরু হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা। ইরান ও ইরাকে নানা ধর্মীয় আয়োজনে সাত দিন এই আনুষ্ঠানিকতা চলবে। এতে বিভিন্ন দেশের নেতা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প-িতেরা অংশ নিয়ে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বসাধারণের জন্য জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সাধারণ মানুষের বিদায় জানানোর সুবিধার্থে খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের কফিন তেহরানের প্রধান ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সমাবেশস্থল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে।
৬ ও ৭ জুলাই খামেনির মরদেহ নিয়ে একটি শোকের মিছিল তেহরানের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করবে। পরে তা রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে ইরানের বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। হাজারো আলেম ও শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা ও গবেষণা করেন। আলি খামেনিও জীবনের একটি পর্যায়ে এখানেই অধ্যয়ন করেছিলেন।
৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে। এরপর নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
নাজাফে অবস্থিত ইমাম আলির মাজার শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতি বছর সেখানে লাখো শিয়া ধর্মানুরাগী সমবেত হন। বিশ্বাস করা হয়, সেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা হজরত আলি ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর সমাধি রয়েছে। অন্যদিকে কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার সৎভাই আব্বাসের মাজারও শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ও আব্বাস নিহত হন।
সবশেষে ৯ জুলাই খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সেদিন মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে। মাশহাদ ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শহর হিসেবে বিবেচিত। ইমাম রেজা শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম।
প্রসঙ্গত, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান।
সর্বশেষ, ইরানের ১৪ দফা শর্তের ভিত্তিতে ১৪ জুন একটি সমঝোতা স্মারক ভার্চুয়ালি স্বাক্ষর করে দুই পক্ষ। অ্যাক্সিওসের সংবাদের তথ্যমতে, ১৪ দফার ভিত্তিতে দুই পক্ষ ৬০ দিনের জন্য আলোচনায় সম্মত হয়েছে এবং ইরানের ওপর হামলা তথা যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে।
ইরানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল : ইমাম আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ইরানে পৌঁছেছে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় ইরান পৌঁছে। এতে অন্যদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
গতকাল দুপুরে নাসীরুদ্দীনের বরাত দিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হয়েছেন। সেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মরদেহ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য আনা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকারসহ প্রতিনিধিদলের বাকি ১০ সদস্য উপস্থিত আছেন।
আজ শনিবার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা এবং আগামী ৯ জুলাই নিজ জন্মস্থানে তাকে দাফন করা হবে। জানাজায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের আজই দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জানাজায় অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধিরা। ইরান সরকারের আমন্ত্রণে ১১ দলীয় জোটের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল খামেনির বিদায়, জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য গতকাল ৩ জুলাই থেকে আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত ইরান সফর করবেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলের অপর সদস্যরা হলেনÑ কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রাজশাহী মহানগরী আমির ড. মো. কেরামত আলী এমপি, মো. নুরুল আমীন এমপি, পিরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা এমপি, ডা. এস এম খালিদুজ্জামান এবং এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।

