ফুটবলের মাঠে অনেক ম্যাচ হয়ে হয়ে ওঠে রূপকথা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বমুখর উপাখ্যান। চলমান ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সাতবার আফ্রিকান নেশনস কাপ বিজয়ী মিশরের। আর এই ম্যাচ ঘীরে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম পরিণত হতে যাচ্ছে দুই প্রাচীন মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মনস্তাত্ত্বিক কুরুক্ষেত্রে। আজ বাংলাদেশ সময় রাত দশটায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে মোড়া, ছাদখোলা বিশালাকার স্টেডিয়ামে বাইশটি জোড়া বুটের লড়াইয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে লিওনেল মেসির জাদুকরী মহিমা ও মোহামেদ সালাহদের ইস্পাতকঠিন জেনোফোবিক প্রতিরোধ। ইতিহাসের খেরোখাতায় আর্জেন্টিনা ও মিশরের মুখোমুখি পরিসংখ্যান হয়তো লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিদের দিকেই ভারী পাল্লা নির্দেশ করছে, কিন্তু বর্তমানের রুঢ় বাস্তবতায় কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়া জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিশরের রূপকথার মতো টাইব্রেকার জয় এই ম্যাচকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও রোমাঞ্চের মধ্যে।
বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয়টি আকাশী-সাদাদের জন্য আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি ছিল অস্বস্তিকর আত্মদর্শনের স্মারক। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মতো প্রতিপক্ষকে অনায়াসে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া লিওনেল স্কালোনির দল হয়তো ভাবতেও পারেনি নকআউটের প্রথম ধাপেই আনকোরা এক আফ্রিকান শক্তির সামনে তাদের রক্ষণভাগ এমন খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াবে। ১০০ মিনিটের বেশি সময় ধরে চলা সেই স্নায়ুযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয় এলেও, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণ এবং মাঝমাঠের খামতিগুলো এখনও ফুটবল প-িতদের আতশকাঁচের তলায়। মাঠে ঠিক কী ধরনের ট্যাকটিকাল ও ফিজিক্যাল বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা নিয়ে স্বয়ং লিওনেল মেসিও সৎ এবং অকপট। টুর্নামেন্টে নিজের ৭ম গোল করার পরেও মেসি স্বীকার করেছেন, প্রতিপক্ষ বল ধরে রেখে তাদের রীতিমতো মাঠ জুড়ে দৌড় করাচ্ছিল এবং আর্জেন্টিনা তাদের ওপর কোনো কার্যকর চাপ বা আধুনিক প্রেসিং তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
এই সমীকরণে দাঁড়িয়ে মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে একাদশে বড়সড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন লিওনেল স্কালোনি। কোচের ব্লুপ্রিন্টে রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে একটি করে পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য মাঝমাঠের গতি ফিরিয়ে আনা এবং আক্রমণভাগে মেসির জন্য একজন যোগ্য ও সচল অংশীদার খুঁজে নেওয়া। গোড়ালির চোটের কারণে ম্যানচেস্টার সিটির তরুণ স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজের ফিটনেস নিয়ে এখনো তীব্র সংশয় রয়েছে, ফলে মেসির সঙ্গী হিসেবে ইন্টার মিলানের লাউতারো মার্টিনেজকেই শুরুর একাদশে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নেন্দেজ এবং ম্যাক অ্যালিস্টারকে নিয়ে গঠিত আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠকে ম্যাচে তাদের চিরচেনা সৃজনশীলতা ও বল দখলের লড়াইয়ে শতভাগ উজার করে দিতে হবে। গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের বিশ্বস্ত গ্লাভস আর ডিফেন্সের কেন্দ্রে রোমেরো-লিসান্দ্রো জুটির ওপর নির্ভর করবে মিশরের গতিময় কাউন্টার অ্যাটাক রুখে দেওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব।
অন্যদিকে মিশরের ফুটবল ইতিহাস এই মুহূর্তে অভূতপূর্ব ও সোনালী বসন্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৩৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে পৌঁছে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই ইতিহাস গড়ে ফেলেছে এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৪-৪ (পেনাল্টিতে ৪-২) গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাসকে নিয়ে গেছে হিমালয়সদৃশ উচ্চতায়। মিশরের প্রধান শক্তি হলো তাদের অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা, সুসংহত ও জমাট রক্ষণভাগ এবং মোহামেদ সালাহর জাদুকরী নেতৃত্বে পরিচালিত অতি দ্রুত আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের দর্শনে। তারা হয়তো প্রতিপক্ষকে অবিরাম আক্রমণ দিয়ে পিষ্ট করে না, কিন্তু খেলাকে দীর্ঘায়িত করার এবং প্রতিপক্ষের ভুল থেকে সুযোগ সদ্ব্যবহার করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে কোচ হোসাম হাসানের এই দলটির। যদিও আহমেদ ফাতুহ এবং মোহাম্মদ আবদেলমোনেমের চোটজনিত কারণে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, যা আর্জেন্টিনার বিশ্বমানের আক্রমণভাগের সামনে তাদের ডিফেন্সের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে, তবুও ওমর মারমুশ, ইমাম আশুর এবং মোস্তফা জিকোর মতো ফুটবলাররা সালাহর পাশাপাশি পাল্টা আক্রমণের পরিস্থিতিতে যেকোনো ডিফেন্সের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠতে পারেন।
ইতিহাসের পরিসংখ্যান অবশ্য আর্জেন্টিনার পক্ষে একচেটিয়া জয়গান গায়। জাতীয় দল পর্যায়ে এই দুই দল এর আগে মাত্র দুইবার মুখোমুখি হয়েছে, এবং দুটি ম্যাচেই লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিরা জয়লাভ করে মোট ৮টি গোল করেছে, যার বিপরীতে মিশর একবারও আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠাতে পারেনি। ২০০৮ সালের সর্বশেষ কায়রোর সেই প্রীতি ম্যাচে সার্জিও আগুয়েরো ও নিকোলাস বুরদিসোর গোলে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল। এই ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা আর্জেন্টিনাকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সেখানে সালাহর মতো একজন বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডের উপস্থিতি যেকোনো পরিসংখ্যানকে বুড়ো আঙুল দেখানোর ক্ষমতা রাখে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন