মধ্যপ্রাচ্যের ইরানে একদিকে চলছে শোকের মাতম, অন্যদিকে আবার শুরু হয়েছে যুদ্ধ। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে কোটি মানুষের আবেগ যখন চরমে, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। কয়েক দিনের ব্যবধানে সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং তেলের বাজারে অস্থিরতাÑ সব মিলিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো অঞ্চল।
নাজাফে জনসমুদ্র : ইরানে কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ নেওয়া হয় প্রতিবেশী ইরাকে। শিয়া মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র নগরী নাজাফে লাখো মানুষ প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার কফিনকে ঘিরে শোকমিছিলে অংশ নেন। রাস্তার দুই পাশে নামে মানুষের ঢল। অনেকের হাতে ছিল প্রয়াত নেতার প্রতিকৃতি, অনেকেই শোক ও প্রতিবাদের স্লোগান দেন।
নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করেন ইরাকের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা এবং ইরানের প্রতিনিধিরা। পরে কফিনটি ইমাম আলীর পবিত্র মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দোয়া শেষে মরদেহ কারবালায় নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত দাফনের জন্য তা আবার ইরানের জন্মস্থান মাশহাদে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
শোকের মধ্যেই নতুন সংঘাত : খামেনির জানাজা চলাকালেই আবারও সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাব হিসেবে তারা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই অভিযানে বহু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা জানানো হয়।
অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করে, এই হামলা চলমান সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তেহরানের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের সময় পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান চালিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে ওয়াশিংটন।
পাল্টা আঘাতের দাবি : মার্কিন হামলার পরপরই ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরনিয়ন্ত্রিত উড়োজাহাজের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি একটি মার্কিন দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করা হয়।
যদিও এসব দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি, তবু উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। কয়েকটি দেশে সতর্কসংকেত বাজানো হয় এবং সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে দ্বন্দ্ব : বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ তাদের নির্ধারিত পথ ব্যবহার করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিকল্প নিরাপদ পথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই মতবিরোধের মধ্যেই কয়েকটি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়। কিছু জাহাজে আগুন লাগে, আবার কিছু জাহাজ কাঠামোগত ক্ষতির মুখে পড়ে। এর পর থেকেই প্রণালিতে চলাচলকারী বহু জাহাজ যাত্রাপথ পরিবর্তন কিংবা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা : মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। সেই সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানের ওপর কিছু অর্থনৈতিক বিধি-নিষেধ সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা, পাল্টা হামলা এবং নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানই প্রথম যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
কঠোর অবস্থানে দুই পক্ষ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ। একই সঙ্গে তিনি নতুন আলোচনার সম্ভাবনা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তারা কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। তাদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজন হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা : সংঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক পরিবহন ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
বিশ্বের বহু দেশ তাদের জ্বালানির জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নাবিকদের দুর্ভোগ : সাম্প্রতিক হামলার পর পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত হাজারো নাবিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বহু জাহাজ বন্দরে অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
ধর্মীয় আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা : খামেনির শেষকৃত্য শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ইরানের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনেরও একটি বড় উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। ইরান ও ইরাকের ঘনিষ্ঠ ধর্মীয় সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা গেছে শোকমিছিলে। নাজাফ ও কারবালার মতো পবিত্র নগরীতে লাখো মানুষের উপস্থিতি সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে।
তবে একই সময়ে চলমান সামরিক সংঘাত এই শোকানুষ্ঠানকে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। ফলে শোকের আবহও পুরোপুরি যুদ্ধের ছায়া থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি।

