দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও শেষ হয়নি দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে অনেকেই ঘরে ফিরছেন, কিন্তু ভাঙা বাড়ি, কাদায় ভরা বসতঘর, নষ্ট ফসল ও জীবিকা হারিয়ে শুরু হয়েছে টিকে থাকার নতুন সংগ্রাম।এদিকে চলমান বন্যায় দেশের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সরকার এরই মধ্যে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারসহ দেশের ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ এবং পানিবন্দি পরিবার ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি। বর্তমানে ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৮ হাজার ৪২২ জন অবস্থান করছেন।
বন্যার পানি নামতে শুরু করায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ঘরে ফিরলেও তাদের সামনে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। কোথাও ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, কোথাও কাদা পরিষ্কার ও ঘর মেরামতের কাজ চলছে। অনেকের আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য, গবাদিপশু ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ আরও কয়েকটি জেলায় বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের পুনর্বাসনে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী (দায়িত্বরত কর্মকর্তা) নুসরাত জাহান জেরিন স্বাক্ষরিত বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতিবিষয়ক পূর্বাভাসে বলা হয়, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির স্থিতিশীল থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে। তবে রংপুর জেলার কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি সাময়িকভাবে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। পাশাপাশি গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হওয়ায় নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের পাঁচটি নদী স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলোÑ নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা, সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা ও মারকুলিতে কুশিয়ারা, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদী।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তর এবং ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল ও পশ্চিমবঙ্গে মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের সব বিভাগেই বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও ভারি বর্ষণ হতে পারে এবং সারা দেশে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আমাদের লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, টানা অতিভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে তা আবার নিচে নেমে এসেছে। এতে লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হয়েছে। তবে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সোমবার রাত ১০টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপরে ওঠে। এতে লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েকশ পরিবার পানিবন্দি হয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানি নেমে ৫২ দশমিক ১০ মিটারে দাঁড়ায়, যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক রাসেদুল হক প্রধান বলেন, মঙ্গলবার সকাল থেকেই পানি কমতে শুরু করেছে এবং পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভোগান্তি এখনো শেষ হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনিল কুমার জানান, গত মৌসুমে ১১ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ হওয়ায় বড় ধরনের প্লাবন এড়ানো গেছে। আরও ১০ কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ হলে ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি আরও কমবে। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসনের কাছে আগেই চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা বিতরণ করা হবে।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, চলমান বন্যায় দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। তিনি বলেন, এবারের টানা বর্ষণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। পানি নামতে শুরু করায় বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও সামনে আসছে।
মন্ত্রী জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারের ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বন্যা মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি পুনর্বাসন ও সহায়তা কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন। এর আগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

