ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

ঢাকা-কাঠমান্ডু-দিল্লি, তরুণরা কি বার্তা দিচ্ছে?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম
ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও টানা বৃষ্টির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা, যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজসহ কয়েকটি এলাকায় কোমরসমান পানি ভেঙে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। কেউ নৌকা, কেউ ভ্যান, আবার কেউ হেঁটে পৌঁছেছে কেন্দ্রে। নিজেদের ভিজতে হলেও অ্যাডমিট কার্ড মাথার ওপর তুলে শুকনো রাখার চেষ্টা ছিল সবারই।

চলতি বছর প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে । এ অবস্থায় মঙ্গলবার ঢাকার সায়েন্স ল্যাব ও উত্তরা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের একমাত্র দাবি—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষোভ কেবল একটি পরীক্ষা ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৃহত্তর প্রজন্মগত বাস্তবতার প্রতিফলন। একই ধরনের প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে দুর্নীতিবিরোধী তরুণদের এক সমাবেশে ২৮ বছরের বেশি বয়সীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, যা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নেপোবেবি’ ইস্যু ঘিরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতায় রূপ নেয়। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। এমনকি নেতৃত্ব নির্ধারণে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ঘটনাও নজির সৃষ্টি করে।

ভারতেও তরুণদের ক্ষোভ ভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। দেশটির প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যেখানে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর জবাবে তরুণরা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্রতীকী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে, যা দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং রাস্তায় সমাবেশে রূপ নেয়।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রজন্ম রাষ্ট্রবিরোধী নয়, বরং উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্ব ও প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি তাদের অনাস্থা বাড়ছে। তারা সংগঠিত হলেও প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থাকতে আগ্রহী এবং বিদ্রূপ ও প্রতীককে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের বড় একটি অংশ সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হতে চায় না, তবে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী। সহিংসতার ভয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সীমিত সুযোগ তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে বিসিএস, ব্যাংক চাকরি বা বিদেশে পড়াশোনা—এই তিনটি পথ এখন তরুণদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে দেশত্যাগের প্রবণতাও বাড়ছে।

সার্বিকভাবে বন্যার পানিতে নেমে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের দৃশ্য কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতীক। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু ও দিল্লি—দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা এক ধরনের অভিন্ন বার্তা দিচ্ছে, যেখানে তারা পরিবর্তন চায়, তবে সেই পরিবর্তন পুরোনো কাঠামোর ভেতরে নয়।