ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

পদ্মার ভাঙনে বিলুপ্তির পথে ফয়জুল্লাহপুর গ্রাম

ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৭:৩২ এএম

প্রমত্তা পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ফয়জুল্লাহপুর গ্রাম বিলুপ্তির পথে। নদীর তীব্র স্রোতে প্রতিদিনই বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মার ভাঙন ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর তীব্র স্রোতের কারণে প্রতিনিয়ত মাটি ধসে পড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হার্ডিঞ্জ সেতু এলাকা থেকে শুরু হয়ে এ অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করলেও স্থায়ী কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে নদীতীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।

ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ইয়ার কবিরাজ বলেন, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর আগে তার পূর্বপুরুষেরা চাকলার চর এলাকা থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছিলেন। কয়েক দফা ভয়াবহ নদীভাঙনে সব হারিয়ে এখন যে সামান্য জায়গাটুকুতে বসবাস করছেন, সেটিই তার শেষ সম্বল। তিনি বলেন, ‘এই বাড়িটুকুও যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে রাত কাটাচ্ছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা আফতাবুল সরদার (৭০) বলেন, ‘সবকিছুই নদীতে চলে গেছে। জমিজমা বিক্রি করলে অন্তত কিছু টাকা পাওয়া যেত। কিন্তু নদী তো সবকিছু গিলে নিয়েছে। এখন আমরা একেবারেই নিঃস্ব।’

শুধু আফতাবুল সরদার নন, নদীভাঙনের কারণে বহু পরিবার তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। যারা এখনো এলাকায় আছেন, তারাও প্রতিনিয়ত ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়দের দাবি, পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেও ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদীতীর রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীভাঙন প্রতিরোধে কিছু জিও ব্যাগ ফেললেও প্রবল স্রোত ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সেসব ব্যবস্থা টেকসই হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বারবার অস্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হলেও ভাঙন থামানো সম্ভব হয়নি। তাই স্থায়ী ও মজবুত নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

তাদের ভাষ্য, এলাকার অধিকাংশ মানুষ দিনমজুর ও নি¤œ আয়ের। নিজেরা ভাঙন ঠেকানোর সামর্থ্য নেই। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এলাকা পরিদর্শন করে আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ফয়জুল্লাহপুর এলাকায় নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছি।’ এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের অবশিষ্ট অংশও অচিরেই পদ্মা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এতে শত শত পরিবার স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি এলাকার কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে।