ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

দুর্যোগের মাঝে পরীক্ষা ও ‘কটূক্তি’র জেরে উত্তাল দেশ

ক্ষোভের আগুন রাজপথে

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৫:৫২ এএম

টানা কয়েক দিনের মুষলধারে বৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের অর্ধেকেরও বেশি জেলা এখন পানির নিচে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি, আশ্রয়হীন। বিদ্যুৎহীন বহু উপজেলা, যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এমন এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে যখন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই দায়, ঠিক তখনই স্থগিত না করে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে দেশের ছাত্রসমাজ।

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়, যখন আন্দোলনের মুখে শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে কটূক্তি করেন। মন্ত্রীর এই সংবেদনহীন মন্তব্যের পর আর ঘরে বসে থাকেনি শিক্ষার্থীরা। বন্যা পরিস্থিতি উপেক্ষা করে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছে লাখ লাখ পরীক্ষার্থী।

এদিকে পরীক্ষা না পেছানোর কারণ জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল মিলন। গতকাল সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ ব্যাখ্যা দেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে স্থগিত হওয়া চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষাগুলো নতুন প্রশ্নপত্রে পুনরায় গ্রহণ করা হবে। তিনি সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিজের একটি ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণে দুঃখও প্রকাশ করেন জাতীয় সংসদে।

উপহাসের পাত্র যখন শিক্ষার্থীরা : গত সপ্তাহে দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নেয়। প্লাবিত হয় পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোও। অনেক এলাকায় পরীক্ষার্থীরা বই-খাতা বাঁচিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে। এ অবস্থায় পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজপথে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু গত পরশু সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন পরীক্ষা পেছানোর দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘একটু বৃষ্টি আর জলজট হলেই পরীক্ষা পেছাতে হবে? বর্তমানের ছেলে-মেয়েরা তো দেখছি ফার্মের মুরগির মতো হয়ে গেছে। একটু প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। আমাদের সময়ে আমরা যুদ্ধ-বন্যা পার করে পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষার সূচি অপরিবর্তিত থাকবে।’

মন্ত্রীর এই ‘ফার্মের মুরগি’ বিশেষণটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চরম দুর্ভোগের শিকার পরীক্ষার্থীদের প্রতি এমন উপহাসমূলক মন্তব্যকে ছাত্রসমাজ তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে পরদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রধান শহরে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।

রাজপথে তীব্র বিক্ষোভ, অচল রাজধানী : গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর নীলক্ষেত, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং ফার্মগেট এলাকায় জড়ো হতে থাকে হাজার হাজার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বৃষ্টিতে ভিজে তারা ব্যানার, ফেস্টুন হাতে স্লোগান দিতে থাকে। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিলÑ ‘বন্যাকবলিত এলাকায় খাতা ভাসছে, আমাদের জীবনও বিপন্ন’, ‘আমরা পরীক্ষার্থী, ফার্মের মুরগি নই’ এবং ‘সংবেদনহীন শিক্ষামন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ চাই’।  তবে এর মধ্যে বহিরাগতরাও আন্দোলনের মধ্যে ছিল, যেটা লক্ষ করা গেছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আশাসহ একাধিক পরীক্ষার্থী কান্নাভেজা কণ্ঠে রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদককে জানান, ‘আমার বাড়ি সিলেটে। আমার ঘর বুক সমান পানির নিচে। বই-খাতা সব ভেসে গেছে। মা-বাবা আশ্রয়কেন্দ্রে। আমি কীভাবে পরীক্ষায় বসব? আর আমাদের নাকি সহ্যক্ষমতা নেই! আমরা কি রোবট? মন্ত্রী মহোদয় এসিরুমে বসে আমাদের কষ্ট বুঝবেন না।’

শুধু রাজধানীতেই নয়, একই দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সারা দেশ। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষামন্ত্রীর কটূক্তির প্রতিবাদ ও তার পদত্যাগ দাবিতে রাজপথে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্ধ হয়ে যায় যানচলাচল। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

পুলিশের লাঠিচার্জে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে : বিকেলে রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করে, যার ফলে ঢাকার চারপাশের যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের ভিন্ন সুর ও সরকারের ভেতর অস্বস্তি : আন্দোলন যখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, তখন সরকারের ভেতরেও এই নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ গতকাল দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে তাদের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করা আমাদের দায়িত্ব ছিল। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনাকাক্সিক্ষত। আমরা ছাত্রদের আবেগকে শ্রদ্ধা করি। বন্যাকবলিত এলাকায় সত্যিই পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই অবস্থায় পরীক্ষা সাময়িক স্থগিত করাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হবে।’ প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যে সরকার নিজেই এখন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে।

যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী : টানা বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। এ পরিস্থিতিতে পদত্যাগের দাবির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মন্ত্রী।

পরে জাতীয় সংসদে বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিলের ওপর আনীত সংশোধনী প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন জেলাগুলোতে বন্যার কারণে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে এবং এই পরীক্ষাগুলো পুনরায় নিতেই হবে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের দাবি ও অভিযোগ জানালেও মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, চট্টগ্রাম বোর্ডের জন্য যখন পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, যুক্তিবিদ্যা এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা অন্য আরেকটি প্রশ্নপত্র সেটে নেওয়া হবে, ঠিক সেই সময়েই স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

বক্তব্যের একপর্যায়ে মন্ত্রী সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার একটি মন্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া সমালোচনার বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আঘাত করার জন্য তিনি কোনো কথা বলেননি। তার এই ব্যক্তিগত মন্তব্যে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন বা আহত হয়ে থাকেন, তবে তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন।

মন্ত্রী বলেন, আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। সেই ব্যাপারেও বলতে চাই। আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলি নাই। যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন ‘সিমপ্লি’ আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

এর আগে শিক্ষামন্ত্রী তার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, তার বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উসকানি রয়েছে। তিনি জানান, ‘আমি ছাত্রদের কটূক্তি করার জন্য ওটা বলিনি। আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সব ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। তবে যারা এই দুর্যোগের অছিলায় পরীক্ষা বানচাল করতে চায়, তারা আসলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে। এই আন্দোলনের পেছনে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের হাত রয়েছে। আমরা যেকোনো মূল্যে নির্ধারিত সময়েই পরীক্ষা সম্পন্ন করব এবং পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই আসে না।’

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বন্যা-বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ফের পরীক্ষা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা দ্রুত পড়ার টেবিলে ফিরে যাবে, এটি আমাদের প্রত্যাশা। বন্যা-বৃষ্টিতে পরীক্ষা দিতে না পারলে প্রয়োজনে আবারও পরীক্ষা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুষিয়ে দেওয়া হবে। পদার্থবিজ্ঞানের ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর পাবে শিক্ষার্থীরা।

জনসমর্থন ও আন্দোলনের পরবর্তী রূপরেখা : শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছে অভিভাবক, শিক্ষক এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যেখানে লাখ লাখ সন্তান ও তাদের পরিবার পানিবন্দি ও ক্ষুধার্ত, সেখানে জোর করে পরীক্ষা নেওয়া এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। আমরা আমাদের সন্তানদের এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না।’

শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের পদত্যাগ এবং এইচএসসি পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত না করা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না। আগামীকাল দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ও প্রতীকী পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগের কালো মেঘের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের আগুন। এখন দেখার বিষয়, সরকার শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক ও আবেগময় দাবির মুখে নতি স্বীকার করে পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়, নাকি এই সংকট আরও চরম আকার ধারণ করে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর জরুরি বৈঠক : গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। এর আগে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা গ্রহণ এবং পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ সম্বোধন করায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। পরে তারা সংসদ ভবনের দিকে যায় এবং পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং সরিয়ে দেয়।  শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখান থেকে তারা ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করেন।