ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

এখনো কাঁদছে জুলাই আন্দোলনে আহতরা

স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ১২:৪৩ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক আহত মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কারও শরীরে এখনো রয়ে গেছে গুলির স্প্রিন্টার, কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, কেউ আবার পঙ্গুত্ব নিয়ে বিছানায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের চিকিৎসা অসম্পূর্ণ, পুনর্বাসন অনিশ্চিত এবং জীবিকার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিটা মুহূর্ত তাদের কাছে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায়। হাসপাতালে এখন আর উল্লেখযোগ্য কোনো জুলাইয়ে আহত রোগী ভর্তি না থাকলেও ক্ষতস্থানের ঘা নিয়ে এখনো কাতরাচ্ছেন অনেকে। সুচিকিৎসার আশায় কাটাচ্ছেন অপেক্ষার প্রহর। তাদের সবারই সরকারের পক্ষ থেকে সুদৃষ্টির প্রত্যাশা যেন শেষ হয় না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিজেদের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন করেন গণঅভ্যুত্থানে আহতরা। আহত ও শহিদ পরিবারের সদস্যদের মাসিক ভাতার আওতায় আনাসহ বিভিন্ন দাবিতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ের সামনে একাধিকবার পালন করেন প্রতিবাদ কর্মসূচি।

এখনো অনেক জুলাই যোদ্ধা ক্ষতের ঘা শরীরে নিয়ে কাতরাচ্ছে দাবি করে ওই সময়কার শহিদ পরিবার ও আহতদের পক্ষে সমন্বয়ক আরমান হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা এই আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা। আমাদের রক্তের উপর প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার, এখন বিএনপি সরকার দাঁড়িয়ে আছে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে আমরা অবহেলিত থাকছি। আমাদের অনেক ভাই এখনো কাঁদছে কষ্টে। আত্মসম্মানের জন্য না পারছে কারো কাছে হাত পাততে, না পারছে ভিক্ষা করতে। এর জন্য কি আমরা স্বৈরাচারের পতনের আন্দোলন করেছিলাম? আমি নিজে চোখে আঘাত পেয়েছি। দীর্ঘদিন চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলাম। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি। কিন্তু এখন আর আমাদের খোঁজ আর কেউ নেয় না। আহতদের তালিকা তৈরি করতে পর্যন্ত বৈষম্য করা হয়েছে। তাহলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করে কী লাভ হলো?

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে আহতদের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালেই গঠন করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর। যার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আহতদের তালিকা সংরক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা। তবে মাঠপর্যায়ে আহতদের অভিযোগ ভিন্ন।

অনেকেই বলছেন, এককালীন সহায়তা পেলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, কৃত্রিম অঙ্গ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কিংবা কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে আন্দোলনের সময়ের শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটও প্রতিদিন তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অনেকেরই দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রোপচার, ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন এবং মানসিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন। এসব সেবা নিয়মিত না পেলে স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকি বাড়ে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তদন্ত মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত এবং ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ চোখের গুরুতর আঘাতে আক্রান্ত হন, যাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। আজও সেই আহতদের অনেকের প্রশ্ন আন্দোলনের সময় যে রাষ্ট্র তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবে পৌঁছেছে? তাদের জন্য কি কেবল স্মরণসভা ও আনুষ্ঠানিকতা, নাকি নিশ্চিত হবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনে ফেরার সুযোগ?

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের হাসপাতালে থাকা নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি। বিশেষ করে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) ও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ও হাসপাতালকে (এনআইও) দিনের পর দিন দিন তাদের দখলে রাখার অভিযোগ ওঠে। জুলাই ঘোষণাপত্র না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল না ছাড়ার ঘোষণাও দেন তারা। এর একমাত্র কারণ হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তাকে দায়ী করছেন তারা। ভাতার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের চাহিদা ছিল সবারই। এমনকি চেয়েছেন বাসস্থানেরও সুবিধাও।

কিন্তু আন্দোলনের দুই বছরের মাথায় আপনাদের চাহিদা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে জানতে চাইলে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শংকিত অবস্থায় দিন পার করা চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া আহতদের একজন মোহাম্মদ আল মিরাজ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নিজেদের বিভিন্ন অঙ্গের বিনিময়ে দেশ থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করেছি। বিনিময়ে  সরকারের কাছে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি করেছি। নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে দেখার কেউ নেই। এক চোখ নিয়ে জীবনে আর কি করতে পারব কিছুই জানি না।

অন্তর্বর্তী সরকার তাকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে চিকিৎসার পরও আমি এক চোখ দিয়ে দেখি না। ডান চোখে এখনো বুলেট আছে। এটা বের করলে চোখের আকৃতি নষ্ট হয়ে যাবে। তাই সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা এটি বের করা যাবে না বলে জানিয়েছেন। তাদের চিকিৎসায় বাম চোখে ৪০ শতাংশ দেখি। দুই থেকে ৩ হাত দূরত্বে মানুষ দেখি। সরকার কতজনকে কতকিছু দিচ্ছে। কিন্তু যাদের রক্ত-অঙ্গের বিনিময়ে তারা আজ ক্ষমতার মসনদে তারা আর আমাদের কথা ভাবছে না।

একই দাবি পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদেরও। এমনকি তারা নানান সময় দাবি আদায়ে হাসপাতালের  কর্মীদের সঙ্গে মারামারিতেও জড়িয়েছেন। মামুন আহমেদ নামে এক আহত শিক্ষার্থী বলেন, আমরা স্বৈারাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আহত হয়েছি। কিন্তু বিনিময়ে বর্তমান সরকারের কাছ থেকে কিছুই পাইনি। জীবনের নিরাপত্তা পর্যন্ত না। ভবিষ্যতের নিরাপত্তা দূরের কথা।

তবে জুলাই চিকিৎসা বা যেকোনো সুবিধা নিশ্চিতে সরকার খুবই আন্তরিক উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রায় ১৫ বছরের দুঃশাসনের পর ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে আবু সাঈদসহ অসংখ্য শহিদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশে পুনরায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাদের ত্যাগ আমাদের বাঁচার অধিকার দিয়েছে, তাদের ত্যাগ আমাদের মুক্তি দিয়েছে। আমরা স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত একদিনে ঘটে না। অনেক কিছু জমা হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। তেমনি জুলাই আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয় ২০০৯ সাল থেকে আমাদের নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১৫ বছরের সংগ্রাম ও আন্দোলনের মাধ্যমে। এসময় অসংখ্য নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল গত প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচার করেছে। তাদের আচরণ ছিল হিংস্র। আমরা জুলাইযোদ্ধাদের জন্য যা যা করণীয় সব করব। কেউ একজনও যদি চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকে বা জীবিকা নির্বাহে অক্ষম হয় তাহলে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা রয়েছে। তাই কারোই হতাশ হওয়ার কিছু নেই।