ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

শেষ পর্যন্ত লড়বে ইরান

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০২:২৬ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থান দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চল, উপকূলীয় সামরিক স্থাপনা এবং কৌশলগত দ্বীপগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের অলঙ্ঘনীয় ‘লাল রেখা’ ঘোষণা করে জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করারও হুমকি দিয়েছে তেহরান।

হরমুজকে ‘লাল রেখা’ ঘোষণা : ইরানের সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইরান তার পুরো ভূখ- থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা রাখে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের লড়াই এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

দক্ষিণ ইরানে টানা হামলা : গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে। বন্দর আব্বাস, চাবাহার, কেশম, সিরিক, কোনারাক, গ্রেটার তুনব দ্বীপসহ বিভিন্ন সামরিক ও উপকূলীয় এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরানের আশপাশেও হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা এই সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

মার্কিন বাহিনীর দাবি, এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন অবকাঠামো, নজরদারি ব্যবস্থা এবং সামরিক কমান্ড কেন্দ্র ধ্বংস করা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা কমিয়ে আনাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে।

পাল্টা হামলায় উপসাগরজুড়ে উত্তেজনা : যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাত হানার দাবি করেছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েতের একটি সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্র, রাডার ব্যবস্থা এবং একটি সামরিক জেটিতে আঘাত হানার দাবিও করেছে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।

বাহরাইন জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি আকাশ হামলা প্রতিহত করেছে। কুয়েতও বৈরী ড্রোনের হুমকির কথা স্বীকার করেছে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের হুঁশিয়ারি : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করেছে, অবরোধ অব্যাহত থাকলে শুধু হরমুজ নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকেই তেল ও গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তাদের ভাষায়, ‘এই অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি হবে সবার জন্য, নয়তো কারো জন্য নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরল গ্যাস এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে।

প্রতিবেশীদের প্রতিও কড়া বার্তা : ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে। তাদের অভিযোগ, যদি কোনো দেশ নিজের ভূখ- বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সুযোগ দেয়, তাহলে সেই দেশও পাল্টা আঘাতের মুখে পড়বে। এই বক্তব্যের পর উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। অনেক দেশ ইতিমধ্যেই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

বাব আল মান্দেবেও নতুন শঙ্কা : সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাত আরও বাড়লে ইরান তাদের মিত্র ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বাব আল মান্দেব প্রণালিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদি হরমুজ ও বাব আল মান্দেবÑ দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অচল হয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে বিতর্ক : এই সংঘাতের আর্থিক ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারি হিসাবে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বলা হলেও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে সেই অঙ্ক প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই ব্যয়ের মধ্যে সামরিক অভিযান, যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র প্রতিস্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো মেরামতের খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ব্যয় আরও দ্রুত বাড়বে এবং তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।

বিশ্ববাজারে প্রভাব স্পষ্ট : হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সার, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মুক্তি পেলেন মার্কিন নাগরিক : চলমান সংঘাতের মধ্যেই ঘটেছে এক ইতিবাচক ঘটনা। ইরানে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত এক মার্কিন নাগরিক দেশটি ছাড়ার অনুমতি পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এই ঘটনাকে সদিচ্ছার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ফলে এটিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির সূচনা বলা এখনই কঠিন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।