রাজশাহীর দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ এখন সবুজে ঘেরা। বাতাসে দুলছে সারি সারি পাটগাছ, যা কয়েক সপ্তাহ পরেই পরিণত হবে দেশের ঐতিহ্যবাহী ‘সোনালি আঁশে’। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকিতে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশায় এখন বুক বাঁধছেন স্থানীয় পাটচাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে এই আবাদ ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে জেলায় ১ হাজার ৯৪ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাগমারা, মোহনপুর, পবা, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর, চারঘাট, পুঠিয়া, তানোর ও বাঘাÍজেলার প্রতিটি উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ।
মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, কোথাও কোথাও পাট কাটা শুরু হয়েছে, আবার কোথাও চলছে পাট জাগ দেওয়ার প্রস্তুতি। খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয়গুলোতেও কৃষকদের ব্যস্ততা বাড়ছে। চাষিরা জানান, এ বছর রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় পাটের বৃদ্ধি অত্যন্ত আশানুরূপ। তবে সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে এই আবাদ আরও অনেক গুণ বাড়বে।
পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বিশ্বব্যাপী পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য এই খাতটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে পাটের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে উৎসাহিত করায় ফলন ভালো পাওয়া যাচ্ছে। আমরা আশাবাদী, কৃষকরা বাজারে তাদের পণ্যের কাক্সিক্ষত মূল্য পাবেন, যা তাদের আগামীতেও পাট চাষে উদ্বুদ্ধ করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্য পৌঁছে দেওয়া গেলে রাজশাহীর কৃষি অর্থনীতিতে পাট নতুন মাত্রা যোগ করবে। এটি কেবল কৃষকের আয়ই বাড়াবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি করবে নতুন কর্মসংস্থান। সোনালি আঁশের এই সুদিন ফিরে আসা দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

