ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ফ্যাসিবাদী সরকার নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল বেশ পরিকল্পিতভাবে। দীর্ঘদিন নির্বাচনের বাইরে থাকা বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের পর পার হয়েছে পাঁচ মাস। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর এবার তৃণমূলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সামনে নির্দলীয়ভাবে হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এই নির্বাচনকে দল ও সরকারের জন্য এক মস্ত বড় ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। ফলে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হঠকারিতা বা স্বজনপ্রীতি নয়, বরং কঠোরভাবে সতর্ক অবস্থানে থাকতে চায় বিএনপি। যোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মুখ খুঁজে বের করতে তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষ জরিপ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি।
দলীয় প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনের রেওয়াজ দেশে দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই বিধান ছিল না। কিন্তু রেওয়াজ ভেঙে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয় প্রতীকে করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। এতে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা। সেই সহিংসতা থামানোর লক্ষ্যে আবার দলীয় প্রতীকমুক্ত নির্বাচনের পথে হাঁটছে বর্তমান সরকার। এখন প্রশ্ন হলো, সেই নির্বাচন কবে শুরু হতে যাচ্ছে? এ বিষয়ে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে নির্বাচনের তথ্য জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে অক্টোবরে নির্বাচন করার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
সরকারের একটি অংশ এবং নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তপশিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনও ইউপি নির্বাচনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি গুছিয়ে আনছে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ইসির এই প্রাথমিক রোডম্যাপের তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন একটি প্রাথমিক পথরেখা প্রণয়ন করেছে। ইউপি, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য পৃথক রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যা চলতি জুলাই মাসের শেষদিকে চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হতে পারে। প্রথম ধাপের ভোট শুরু হওয়ার পর থেকে পরবর্তী ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
বিগত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরই জনপ্রতিনিধিশূন্য। এ কারণে বিশেষত গ্রামীণ প্রশাসনিক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে একত্রে সব নির্বাচন নয়, ধাপে ধাপে ভোট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবশ্য সীমানা নির্ধারণ, আইন ও বিধিমালা সংশোধন, আচরণবিধি চূড়ান্তকরণ এবং সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ওপর এই চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ে এলোমেলো পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গুরুত্বসহকারে দেখছে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে রাত পৌনে ১০টা পর্যন্ত চলা ওই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলের রণকৌশল, সরকারের চলমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল্যায়ন, মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান এবং দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনসহ একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ রোডম্যাপের চুলচেরা বিশ্লেষণও করা হয় সেখানে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নির্দলীয়ভাবে হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে নাগাদ শুরু করা যেতে পারে, তা নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে দু-একজন সদস্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেনÑ যেখানে উপদেষ্টা বলেছিলেন, আগামী অক্টোবর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ স্থায়ী কমিটির সিনিয়র বেশির ভাগ সদস্য অক্টোবরে ভোট শুরুর বিষয়টি নাকচ করে দেন। অবশ্য চলতি ২০২৬ সালের শেষভাগের মধ্যেই নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে একমত হয়েছেন সবাই। তবে ঠিক কোন মাসে প্রথম ধাপের ভোট হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য মনে করেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। কারণ, বিগত দেড় দশকে মাঠ পর্যায়ের সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো পকেট কমিটি বা অন্ধ দলীয়করণের মাধ্যমে প্রার্থী না দিয়ে, এখন থেকেই যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের পক্ষে মত দেন তারা।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে দলীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপ চালানো হবে। জরিপে যারা জনপ্রিয় ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রমাণিত হবেন, তাদেরই স্থানীয় নির্বাচনে দলের সমর্থন বা সবুজসংকেত দেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখন নতুন ইস্যু পলাতক সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার দেশে ফেরা। ক্ষমতাচ্যুৎ আওয়ামী লীগের একাধিক মন্ত্রীও দেশে ফেরার বিষয়ে আওয়াজ তুলেছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেই ঝুঁকি মাথায় রেখে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। তারা কি সত্যি ফিরছেন, নাকি ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছেনÑ তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা বাহিনী।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য মাঠ পর্যায়ের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। ইতিমধ্যে কোন কোন ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছেÑ সেই তথ্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনকি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পৃথকভাবে রাখা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের সাড়ে চার হাজারেরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইসি পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে আইন, বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আচরণবিধির খসড়া ইতিমধ্যে ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের মতামত যাচাই-বাছাই করে এটি দ্রুত চূড়ান্ত করা হবে।’ তবে তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, সীমানা নির্ধারণ ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে লিখিত-অলিখিত আলোচনা ছাড়া ইসির পক্ষে এককভাবে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ইসি অক্টোবরকে টার্গেট করেই তাদের কর্মপরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় ও গোষ্ঠীগত কোন্দল বেশি থাকে এবং অতীতে এই স্তরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘাত-সহিংসতার নজির রয়েছে। তবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলে সহিংসতা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান নির্বাচন বিশ্লেষকরা। এদিকে ইসি সূত্র জানিয়েছে, এবার ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করার মূল উদ্দেশ্যই হলো, প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো মূল্যায়ন করে পরবর্তী ধাপের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ছক তৈরি করা। প্রাথমিকভাবে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনি এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও সব স্তরের নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও ইসির সমন্বয় সভায় আমিও জোর দিয়েছি একটি সহিংসতামুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর। যে নির্বাচনি ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী সরকার ধ্বংস করে দিয়ে গেছে, সেই নির্বাচন মানুষের অংশগ্রহণে করতে চায় বিএনপি সরকার। মানুষ ভোট দিয়ে তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতেই কাজ করছে আমাদের সরকার। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জোরেশোরে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। চলতি বাজেটে সেই নির্বাচনের জন্য বরাদ্দও রাখা হয়েছে।’
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে যেমন নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপর চাপ রয়েছে, ঠিক তেমনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্যও এটি পকেট নেতা বনাম মেধার রাজনীতির এক অ্যাসিড টেস্ট হতে যাচ্ছে। আর দলীয় প্রতীক না থাকায় রাজনীতি স্থগিত দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও সেই নির্বাচনে কৌশলে অংশ নেবেন বলে আওয়াজ দিয়ে যাচ্ছেন।

