ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত

তীব্র হচ্ছে পাল্টাপাল্টি হামলা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:০১ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি ভেঙে পড়ায় জুন মাসের শেষ থেকে নতুন করে দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত বর্তমানে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইরানের রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠসহ দেশটির উত্তরাঞ্চলের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পাল্টা আঘাত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের জ¦ালানি রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান, যার ফলে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ¦ালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে এই হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের বন্দর আব্বাস, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রেটার তুনব দ্বীপ, চাবাহার, কোনারক, রাসক, খোররামাবাদ, সেমনানসহ বহু অঞ্চলের কমান্ড সেন্টার, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং উপকূলীয় নজরদারি চৌকি লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করে। হামলায় আহভাজ শহরের একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২১১ জন রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির এসব হামলায় কুয়েতের একটি পানি শোধনাগার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করেছে তেহরান। ইরানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর রাডার-ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং জ¦ালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সুপার হক রাডার এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে মার্কিন যোগাযোগব্যবস্থা ও সেনাসমাবেশ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তবে জর্ডান সরকার দাবি করেছে, তারা আকাশেই ইরানের আটটি ক্ষেপণাস্ত্র বাধা দিয়ে ধ্বংস করেছে। ইরাকের ইরবিল শহরে পাঁচটি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে দুটি মার্কিন ঘাঁটির কাছে বিধ্বস্ত হয় এবং একটি মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে ভূপাতিত করা হয়।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, গত রাতের মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে জর্ডানে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক বিমানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব বিমানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

ইরান চুক্তি করতে চাইছেÑ ট্রাম্প : পেনসিলভানিয়ার ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পর্দার আড়ালে একটি শান্তিচুক্তি করতে চাইছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যা করছি তা তারা পছন্দ করছে না এবং তারা এর সমাধান চায়। এখন দেখা যাক আমরা তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসি, নাকি এই অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি টানি।’

ইসরাইলি মন্ত্রীদের জাহান্নামে যেতে বললেন ভ্যান্স : যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরাইলি সরকারের ভেতরের কিছু অংশের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা নস্যাৎ করার এবং যুদ্ধ জারি রাখতে মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেছেন, তারা যেন ‘জাহান্নামে যায়’।

ফের আলোচনার জন্য পাকিস্তানের তোড়জোড় : মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা বন্ধ করে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদাবি বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে পাকিস্তান সব পক্ষকে সহিংসতা পরিহার করে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য উৎসাহিত করে যাবে।’

টানা চতুর্থ দিন বাড়ল বিশ্ববাজারে তেলের দাম : এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ¦ালানি বাজারে টানা চতুর্থ দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা, হরমুজ প্রণালিতে জ¦ালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।