দীর্ঘ ৩৯ দিনের অপেক্ষার প্রহর শেষ। গতকাল রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় (সোমবার) আমেরিকার নিউজার্সি রাজ্যের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের লড়াইয়ে ফুটবলের নতুন চ্যাম্পিয়নকে বরণ করে নিয়েছে বিশ^। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই শুধু ৯০ মিনিটের খেলা ছিল না, ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চের এক বিশাল আয়োজনও। নতুন বিশ^চ্যাম্পিয়নকে বরণের পাশাপাশি আজ পর্দাও নামল ‘গ্রেটেস্ট শো অন দি আর্থ’-এর। ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপের আবেগ, উন্মাদনা আর উৎসবের আবহে রাজধানী ঢাকাও সেজেছিল ভিন্ন এক রূপে। বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনের পাশাপাশি ছিল জনপ্রিয় শিল্পীদের কনসার্ট ও দর্শকদের অংশগ্রহণে নানা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান।
১০৪টি ম্যাচের লড়াইয়ে ৪৬টি দলের বিদায়ের পর বর্তমান বিশ^চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুকুট ধরে রাখার লড়াইয়ের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ছিল দ্বিতীয়বার বিশ^কাপ জয়ের স্বপ্ন। দুই দলের দ্বৈরথে নতুন বিশ^চ্যাম্পিয়ন বরণের মাধ্যমে বিশ^ ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বও নির্ধারণ হয়ে গেল। পাশাপাশি এই দ্বৈরথ ছিল গুরু স্পেন কোচের বিরুদ্ধে শিষ্য আর্জেন্টিনা কোচেরও।
সেমিফাইনালের মহারণে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর থেকেই চ্যাম্পিয়ন কে হতে পারে তা নিয়ে বিশ^জুড়ে চলেছে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। কম্পিউটারের ডেটা অ্যানালিসিস থেকে বিভিন্ন বেটিং অ্যাপে চলেছে ফাইনালিস্ট খোঁজার প্রতিযোগিতা। তবে শেষ পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে যোগ্যতর দলই চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করল।
আর্জেন্টিনার ক্রীড়া সংবাদ মাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস আগেই জানিয়েছিল, ফাইনালের একাদশে খুব একটা পরিবর্তন আনবেন না কোচ লিওনেল স্কালোনি। একাদশের দুটি পজিশন নিয়ে কিছুটা চিন্তা ছিল। দুটির একটি হচ্ছে রক্ষণভাগে। রাইটব্যাক নাহুয়েল মলিনার জায়গা গঞ্জালো মন্তিয়েলকে নামাতে পারেন আর্জেন্টিনার কোচ। অন্যদিকে মিডফিল্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একাদশে জায়গা হারান রদ্রিগো ডি পল। তার পজিশনে খেলেন জুলিয়ানো সিমিওনে। বেঞ্চ থেকে পরে মাঠে নেমে অবশ্য দারুণ খেলেছেন ডি পলও। এ ছাড়া অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার জিওভান্নি রো সেলসোকেও মাঠে দেখা যেতে পারে। আর্জেন্টিনার একাদশ ছিলÑ এমিলিয়ানো মার্তিনেজ (গোলরক্ষক), গঞ্জালো মন্তিয়েল, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, জুলিয়ানো সিমিওনে, এনজো ফার্নান্দেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টার, লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার এই একাদশের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের টিমকেই নামিয়েছিল স্পেন। স্পেনের একাদশে ছিলÑ উনাই সিমন (গোলরক্ষক), পেদ্রো পেরো, পাউ কুবার্সি, আইমেরিক লাপোর্তে, মার্ক কুকুরেয়া, রদি, ফাবিয়ান রুইস, লামিন ইয়ামাল, দানি অলমো, আলেক্স বায়েনা ও ১১. মিকেল ওইয়ারসাবাল।
ফুটবল বিশেষজ্ঞ, উভয় দলের খেলোয়াড় ও কোচেরা মহারণের আগে বলেছিলেন, কঠিন একটি ফাইনাল হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা-স্পেনের মধ্যে। মাঠের খেলায়ও কমবেশি তাই প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ^কাপে স্পেন-আর্জেন্টিনা তাদের আগের খেলাগুলোর মতোই একই ধারায় খেলেছে ফাইনালে। রক্ষণে দুর্বলতা থাকলেও আক্রমণে তা পুষিয়ে দিচ্ছিল আর্জেন্টিনা। ফাইনালেও কমবেশি একইরকম ছিল। অন্যদিকে স্পেন রক্ষণ ও আক্রমণ উভয়দিকেই ব্যালান্সড ছিল। অনুমিতভাবেই দুই উইং দিয়ে আর্জেন্টিাকে আক্রমণ করেছে স্পেন। অন্যদিকে উইংয়ের দুর্বলতায় আর্জেন্টিনাকে মাঝমাঠ দিয়েই অধিকাংশ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয়।
স্পেনের খেলোয়াড়রা ফাইনালে শুধু বল নিয়ন্ত্রণই নয়, আর্জেন্টিনার তুলনায় বেশি দৌড়েছেন এবং বেশি গতিতে ছুটেছেন। প্রতিপক্ষের অর্ধে গিয়ে বল কেড়ে নেওয়ার দিক থেকেও তারা অন্যতম সেরা দল। দলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দ্বৈরথও চ্যাম্পিয়ন দলকে সাফল্যের পথ দেখিয়েছে। যেমনÑ দুর্বার মেসিকে জায়গা ছেড়ে দিলে যে সর্বনাশ, তা ভালো করে জানা ছিল স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের। প্রতিপক্ষের অধিনায়ককে তাই কড়া পাহারায় রাখার গুরুত্বদায়িত্ব ছিল স্পেনের ডিফেন্ডার এমেরিক লাপোর্তের কাঁধে। পাশাপাশি পাউ কুবার্সি ও পেদ্র পেরোও ছিলেন সজাগ। একইরকমভাবে যুদ্ধ চলেছে ১৯ বছর বয়সি স্পেনের লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে আর্জেন্টিনার রক্ষণ দেয়ালের সবচেয়ে শক্ত পাথর নিকোলাস তালিয়াফিকোর। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আগেই বোঝা যাচ্ছিল, মেসি ও ইয়ামালকে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে হলে ঠিকঠাক পেতে হবে বলের জোগান। আর সেটা আসবে মাঝমাঠ থেকে। মাঝমাঠ দখলের তুমুল লড়াই অনুমিত ছিল স্পেনের রদ্রি ও আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের মধ্যে। ফাইনালের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকায় ছিল এই তিনটি দ্বৈরথ।
এদিকে নতুন বিশ^চ্যাম্পিয়নকে বরণের পাশাপাশি পর্দাও নামল ‘গ্রেটেস্ট শো অন দি আর্থ’-এর। দুই দলের দ্বৈরথ শুরুর আগে সমাপনী অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম হাফটাইম শো, বিশেষ পুরস্কার সব মিলিয়ে ফাইনালের পুরো দিনটিই সাজানো ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজনে।
ফাইনাল শুরুর প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায়) শুরু হয় সমাপনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন অস্কারজয়ী শিল্পী জেনিফার হাডসন। এরপর মঞ্চ মাতান রবি উইলিয়ামস, লরা পাউসিনি, নিকোল শেরজিঙ্গার ও জনপ্রিয় ইউটিউবার আইশোস্পিড। অনুষ্ঠানে বিশেষ উপস্থিতি ছিল হলিউড তারকা টম ক্রুজেরও।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ফাইনালে ছিল সুপার বোলের আদলে হাফটাইম শো। ১১ মিনিটের মূল পরিবেশনায় অংশ নেন ম্যাডোনা, শাকিরা, জাস্টিন বিবার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএস। পুরো আয়োজনের তত্ত্বাবধানে ছিল কোল্ডপ্লে ব্যান্ডের প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিন। এর আগে দুই দলের লড়াই শেষে বিশ্বকাপ জয়ের আনুষ্ঠানিক মুহূর্তে আতশবাজি, কনফেত্তি ও আলোকসজ্জায় উদ্যাপন করা হয় নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে।
এবারই প্রথম বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের জন্য বিশেষ চ্যাম্পিয়নশিপ রিং চালু করেছে ফিফা। চ্যাম্পিয়ন দলের ৩০ সদস্য এই আংটি পাবেন। পুরস্কার বিতরণীর সময় অধিনায়ক ও কোচকে প্রতীকীভাবে একই মাপের আংটি দেওয়া হবে। পরে প্রত্যেকের আঙুলের মাপ অনুযায়ী তৈরি করে ব্যক্তিগত আংটি পৌঁছে দেওয়া হবে।
বিশ্বকাপ জিতে চ্যাম্পিয়ন দল পাচ্ছে ৫ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা) প্রাইজমানি। ট্রফি, পদক ও ব্যক্তিগত পুরস্কারের পাশাপাশি এটিই হবে ফাইনালের সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রাপ্তি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে, মাঝে ও পরে ফুটবলের সঙ্গে বিনোদন, ইতিহাস ও উৎসবের এক অনন্য সমন্বয় দেখল বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক।

