ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

মোদির আশ্বাসেও কমছে না ক্ষোভ

তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে ককরোচ বিক্ষোভ 

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৬:০৯ এএম

ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন রাজধানী দিল্লিকে কেন্দ্র করে বৃহৎ ছাত্র-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শুধু দিল্লি নয়, এই ছাত্র-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে দেশটির অন্যান্য রাজ্যেও। তথ্য অনুসারে, দিল্লির পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের মুম্বাই, কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু ও বিহারের পাটনার মতো শহরগুলোতে বিক্ষোভ চলছে। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেসব স্থানেও আন্দোলনকারীদের দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।

একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শুধু আশ্বাসে তারা সন্তুষ্ট নন। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
অবশেষে মুখ খুললেন মোদি : প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে ভারতে। এতদিন এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি প্রধানমন্ত্রী মোদি। এবার এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ গতকাল বৃহস্পতিবার এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। এটি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপের একটি অংশ। আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ যারা নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

আশ^াসে ভরসা নেই আন্দোলনকারীদের : প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের মূল দাবি অপরিবর্তিত রয়েছে। দলের দাবি, প্রশ্নফাঁসের মতো বড় কেলেঙ্কারির রাজনৈতিক দায় এড়ানো যায় না। তাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে।

আন্দোলনের নেতারা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তারা আপসের পথে হাঁটবেন না। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে এবং তা শান্তিপূর্ণভাবেই অব্যাহত থাকবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্য ‘আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়’ নিয়ে কটাক্ষ করেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবি দিয়ে একটি মিম পোস্ট করেন তিনি। সেখানে লেখা ছিলÑ ‘হাই, আমার নাম নাথিং (কিছুই নয়)।’

দিল্লিজুড়ে উত্তেজনা : শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানী দিল্লির পরিস্থিতি কয়েক দিন ধরেই উত্তপ্ত। সংসদ অভিমুখে মিছিল ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন। পুলিশের দাবি, আহতদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ করে তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ভ-ুল করার চেষ্টা করা হয়েছে।

পরিস্থিতির অবনতির কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অনেক ভূগর্ভস্থ রেলস্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে এবং অনেককে এখনো আটকে রাখা হয়েছে বলে আইনজীবীদের দাবি। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এসব মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।

আন্দোলনে বিরোধী দলের সমর্থন : প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে বিরোধী দলগুলোও সরব হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। সংসদেও বিষয়টি নিয়ে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে বিরোধী জোট।

রাহুল গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্নে কোনো আপস হবে না। আন্দোলনের দাবিকে সংসদের ভেতর এবং বাইরে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনাও নিয়েছে বিরোধী দলগুলো।

তরুণদের ক্ষোভের বিস্তার : বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট, একের পর এক নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা হারানোর প্রতিফলন ঘটছে এই আন্দোলনের মাধ্যমে।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। আবারও পরীক্ষা দিতে বাধ্য হওয়া, মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক এবং ধারাবাহিক অনিয়ম তরুণদের মধ্যে ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

হাস্যরসও প্রতিবাদের ভাষা : এই আন্দোলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো তরুণদের অভিনব প্রতিবাদ। প্রচলিত স্লোগানের পাশাপাশি তারা ব্যঙ্গচিত্র, হাস্যরস, জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান এবং সৃজনশীল পোস্টারের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছেন।

আন্দোলনস্থলে দেখা গেছে, কেউ ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন, কেউ আবার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বা পুরাণের চরিত্র ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করছেন। তরুণদের মতে, হাস্যরস মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি কার্যকর মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

আন্দোলনের বিস্তৃতি : প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বড় আকারের জনআন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এখন হাজারো তরুণ নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। অনেকেই দিনের পর দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন, কেউ কেউ অনশনেও অংশ নিয়েছেন।

আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য, প্রয়োজন হলে তারা আরও দীর্ঘ সময় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাদের মতে, শুধু প্রশ্নফাঁসের বিচার নয়, পুরো পরীক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।

সরকারের সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এটি মোদি সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিরোধী দলগুলোও এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নফাঁসের বিচার এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে না পারলে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তরুণদের আস্থা পুনরুদ্ধার করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

অনিশ্চয়তার মধ্যেই অপেক্ষা : প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কারণ আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি নয়, রাজনৈতিক দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তারা।

ফলে একদিকে সরকারের আশ্বাস, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থানÑ এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভারতের শিক্ষা ও রাজনীতির অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এখন সবার নজর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপথের দিকে।