ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

বিচারে ব্যত্যয় হলেই বিপত্তিতে পড়বে সরকার 

ফারুক আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০২:২৮ এএম

রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়লেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর। মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত এবং পদত্যাগÑ পুরো সময়ে তার কর্মকা-ের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে সংসদের বিরোধী দলসহ কিছু সংগঠন। শুধু বিচার নয়, তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি করা হয়েছে। তারা বলছে, এ বিষয়ে সরকার কোনো ধরনের শিথিলতা দেখালে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে রাজপথে কঠোর কর্মসূচিরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

যদিও তার বিরুদ্ধে মামলা হলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

এদিকে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ঘিরে তার মনোনয়ন থেকে শুরু করে পদত্যাগ পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছু বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে এবং সম্প্রতি ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে এই বিতর্কগুলো তীব্র আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার বিকেলে পদত্যাগ করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কের শেষ নেই। ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাসহ বিভিন্ন মহল থেকে তাকে পদচ্যুত করার দাবি ওঠে। এরপর নানা সময়ে তার পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন, তার ‘নজরবন্দি’ থাকার গুঞ্জন এবং শারীরিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য পদত্যাগের খবরও গণমাধ্যমে আসে। গত ৯ থেকে ১৮ মে লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়ায়। যদিও এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানান, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রপতি এই দাবিকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও কল্পনার বাইরে বলে উড়িয়ে দেন এবং এর কোনো সত্যতা নেই বলে চ্যালেঞ্জ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে গেল। তিনি কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, এ বিষয়ে আমাদের আগ্রহ নেই। কারণ আমরা আগে থেকেই বিবেচনায় নিয়েছি তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকার যোগ্য না।’ তিনি বলেন, তিনি যদি কোনো বেআইনি কাজে জড়িত থাকেন, সেই ধরনের কোনো বিশ্বাসযোগ্য আলামত পাওয়া যায়, তাহলে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নন।’

মো. সাহাবুদ্দিন প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চুপ্পু শারীরিক অসুস্থতার নামে তাকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। ফ্যাসিস্টের এই দোসরকে গ্রেপ্তার করতে হবে। তার বিচার করতে হবে।

মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার না করা হলে রাজপথে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ব্যাংকের অর্থ লুটপাট, পাচারসহ উত্থাপিত সব অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ থেকে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মুহাম্মদ রাশেদ খান বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। নাহিদ ইসলামরা যদি সংবিধান মেনে সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতির হাতে শপথ না নিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করত, সে ক্ষেত্রে দায়মুক্তির প্রসঙ্গ আসত না। সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকত। কিন্তু সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতির হাতে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তাকে একপ্রকার ক্ষমা করে দিয়ে নতুনভাবে বৈধতা দিয়েছিল নাহিদ ইসলামদের পরামর্শে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাশেদ খান বলেন, আপনি কাউকে ক্ষমা করে দিয়ে এবং একপ্রকার নতুনভাবে মূল্যায়ন করে আবার তার বিচার দাবি করতে পারেন না।

সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা হলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আইনমন্ত্রী বলেন, এর আগে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলোর উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন জমা না দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করে। ওই সময় বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, সংসদে একদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। ফলে তার নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয় দায়িত্ব গ্রহণের আগেই। রাষ্ট্রপতি হওয়ার অনেক আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করেন সাহাবুদ্দিন। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ছবিটি নতুন করে ভাইরাল হয়।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থাপক নবনীতা চৌধুরীর একটি ছবিতে সাহাবুদ্দিনের আইডি থেকে করা ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ মন্তব্যের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পলায়নের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথবাক্য পাঠ করান। এই ঘটনা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তখন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। যদিও শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘেœ সম্পন্ন হয়, এর পরই শুরু হয় আরও বড় বিতর্ক।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির সংসদ ভাষণ নিয়েও নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার সময় বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে। একপর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউটও করেন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি তাদের সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই থেকেছেন এবং খুব কমই সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন।