ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

শাপলা চত্বর ‘গণহত্যা’

হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:০১ এএম

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হয়েছিল নারকীয় হত্যাকা-। এই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম অভিযোগপত্র দাখিল করেন। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার আট আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ১৫ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য, ২১ জন সাবেক সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, তিনজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক এবং দুজন সাংবাদিক।

শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর দাবি করেন, ২০১৩ সালের ৫ মে পুলিশ কন্ট্রোলরুমে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের পর মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে অভিযান চালিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হয়।

তার ভাষ্য, অভিযানের পর ঘটনাস্থলের আলামত মুছে ফেলতে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল। বিভিন্ন বাহিনী নিজ নিজ অভিযানের জন্য আলাদা কোডনামও ব্যবহার করে। পুলিশ একে ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, র‌্যাব ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বিজিবি ‘অপারেশন ক্যাপচারড শাপলা’ নামে অভিহিত করে।

প্রসিকিউশনের দাবি, ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে ৩২ জন এবং পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আরও ২০ জন নিহত হন। তদন্তে মোট ৬১ জন নিহতের তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই দুই ঘটনাকে গণহত্যা (জেনোসাইড) হিসেবে বিবেচনা করে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শুনানি শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মামলায় কোনো কনস্টেবল বা নি¤œপদস্থ পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা দায়িত্বশীল পদে ছিলেন এবং ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র ভিত্তিতে তাদের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর তৎকালীন সরকার হত্যাকা-ের কোনো কার্যকর তদন্ত করেনি। বরং ঘটনাকে অস্বীকার ও আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।

মামলায় সাংবাদিক মোজাম্মেল হক ও ফারজানা রূপাকেও আসামি করা হয়েছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শাপলা চত্বরের প্রকৃত ঘটনা বিকৃত করে প্রচার করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

আদালতের পর্যবেক্ষণ : শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী জানতে চান, নিহতদের মধ্যে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ছিল কি না। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে ১৪ ও ১৫ বছর বয়সি তিনজন কিশোরের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের বাইরে গিয়ে কোনো কাল্পনিক তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আসামির তালিকায় যারা : আসামির তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেনÑ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক এমপি আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক এমপি  মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক এমপি সালাউদ্দিন মাহমুদ ওরফে এসএম জাহিদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজামেল বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রূপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটওয়ারী, সাবেক আইজিপি ও তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান,  সাবেক সেনাপ্রধান ও বিজিবির তৎকালীন ডিজি জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক মেজর জেনারেল, এনটিএমসি প্রধান এবং তৎকালীন র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জিয়াউল আহসান, র‌্যাবের তৎকালীন এডিজি (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সাবেক ডিআইজি মোহা. আব্দুল জলিল ম-ল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি; ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান, এসবির তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি সাবেক আইজিপি মাহবুব হোসেন, ডিবির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির উপকমিশনার সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আনোয়ার হোসেন, ডিএমপির তৎকালীন উপকমিশনার সাবেক ডিআইজি মহা. আশরাফুজ্জামান, ডিএমপির তৎকালীন মতিঝিল জোনের এডিসি সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি এস এম মেহেদী হাসান, তৎকালনীন লালবাগ জোনের ডিসি সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, তৎকালীন তেজগাঁও বিভাগের ডিসি সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মতিঝিল জোনের তৎকালীন এডিসি সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, রমনা জোনের তৎকালীন এসি অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং মতিঝিল থানার তৎকালীন ওসি বি এম ফরমান আলী।  তাদের মধ্যে ৩০ জনের বেশি বর্তমানে পলাতক। ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। অন্যদিকে শামসুল হক টুকু, এ কে এম শহীদুল হক, জিয়াউল আহসান, আব্দুল জলিল ম-ল, শাহরিয়ার কবির, দীপু মনি, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ মে শাহবাগ আন্দোলনের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম। দিনভর সংঘর্ষ ও সহিংসতার পর গভীর রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে সমাবেশটি সরিয়ে দেয়।

২০২৪ সালের ২০ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই ঘটনার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা পড়ে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করল প্রসিকিউশন।