যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এখন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জনের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়ায় হোয়াইট হাউজের ওপর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী থাকলেও এখন ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে লক্ষ্য অর্জন যেমন কঠিন হয়ে উঠেছে, তেমনি যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসাও সহজ নয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো এবং তেহরানের ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। তবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়নি। বরং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের ধারণা ছিল, ব্যাপক সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুসারে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কৌশল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
এরই মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়েছে, শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর-সংলগ্ন সমুদ্রপথও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
একপর্যায়ে ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভান্ডারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিলেও পরে তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, সামরিক অভিযানের সীমাবদ্ধতা এখন হোয়াইট হাউজকেও নতুন হিসাব কষতে বাধ্য করছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু পররাষ্ট্রনীতিতেই নয়, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তেও পড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রাম্প সেটি কার্যত স্থগিত করেন। তিনি জানান, সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত ওই উদ্যোগ কার্যকর হবে না।
এই সিদ্ধান্তে রিয়াদ বিস্ময় প্রকাশ করে। পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, এতে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।
এরপর কানাডার সঙ্গে যৌথ অবকাঠামো প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও বাতিলের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। একই সময়ে বিভিন্ন কানাডীয় পণ্যের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
দেশের অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের অবস্থান চাপের মুখে পড়েছে। রিপাবলিকানদের সমর্থিত একটি আবাসন বিল নিয়ে শেষ মুহূর্তে অবস্থান বদলে তিনি তাতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে দলীয় নেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সাফল্যের সুযোগও হাতছাড়া হয়।
জনমতেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্য থেকেও যুদ্ধের দ্রুত অবসানের আহ্বান উঠতে শুরু করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে বর্তমানে তিনটি সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রথমটি হলো, ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। তবে সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এতে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি, মানবিক বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয় পথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তেল পরিবহনের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের ফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে।
তৃতীয় বিকল্প হলো, সামরিক সাফল্যের দাবি তুলে যুদ্ধ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে এটি তুলনামূলক নিরাপদ মনে হলেও বাস্তবে তা ট্রাম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এনে কিংবা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে যুদ্ধ শেষ করলে প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ হবে না।
এদিকে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে টানা হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো বড় সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইউক্রেন, ইউরোপ কিংবা তাইওয়ানকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে প্রতিটি বিকল্পই ঝুঁকিপূর্ণ। সামরিক অভিযান জোরদার করলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে সময় লাগবে। আর যুদ্ধ থেকে সরে এলে ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার দায় তার প্রশাসনের ওপরই বর্তাবে।
ফলে ইরান যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের সক্ষমতারও বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

