× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৭:০৯ এএম

আইনের ব্যারিকেড ভেঙে অধরা রাসেল-শামীমা

শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৭:০৯ এএম

গ্রাফিক্স : রূপালী বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স : রূপালী বাংলাদেশ

অন্তত দুই ডজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, অর্ধডজন সাজার আদেশের পরেও গ্রেপ্তার হচ্ছেন না ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। উল্টো আইনি পদক্ষেপ পাশ কাটাতে চার বছরের জন্য নিজেদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেছেন শামীমা। অথচ ইভ্যালির সরবরাহকারী ও গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও পেমেন্ট গেটওয়ের সামান্য অর্থ ছাড়া অদ্যবধি উল্লেখযোগ্য কোনো পাওনাই দেননি এই দম্পতি। এদিকে ইভ্যালির কার্যক্রমও একপ্রকার স্থবির। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় উচ্চ আদালত কর্তৃক গঠিত কমিটিরও বর্তমানে নেই কোনো কার্যক্রম। যদিও পলাতক অবস্থায় ফেসবুকে ব্যবসা পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ রাসেল। এ অবস্থায় পাওনা ফেরত না পাওয়া ভুক্তভোগীরা রাসেল ও শামীমাকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন চান।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন রাসেল ও শামীমা। সঠিক হিসাব না থাকলেও অভিযোগ আছে, ইভ্যালির কাছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা ভুক্তভোগীদের। গ্রেপ্তারের পর ২০২২ সালের এপ্রিলে জামিনে মুক্তি পান শামীমা। একই বছরের ডিসেম্বরে জামিন পান রাসেল। গ্রেপ্তারের আগে ও পরে এই দম্পতির দাবি ছিল, ছয় মাস ব্যবসা করে পাওনাদারদের অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হবেন তারা। কিন্তু মুক্তির তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পাওনা আদায়ে হন্যে হয়ে ঘুরছেন ভুক্তভোগীরা। ইভ্যালিকে সহজে ব্যবসা করতে দিতে রাসেলের শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভায়রা যুক্ত হন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে। আদালতের অনুমতি নিয়ে জেলে থাকা অবস্থাতেই রাসেল ও শামীমা নিজেদের অর্ধেক শেয়ার হস্তান্তর করেন তাদের। এরপর জামিনে বের হয়ে প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন রাসেল নিজেও। তবু ব্যাবসায়িকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ইভ্যালি।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অনেকেই আইনের আশ্রয় নিয়ে মামলা করেছেন- এমন অন্তত ছয়টি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে রাসেল-শামীমা দম্পতির। আর অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার টাকার। তাদের বিরুদ্ধে সাজার প্রথম রায়টি আসে ২০২৪ সালের জুনে। চট্টগ্রামের এক গ্রাহকের দায়ের করা মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড হয় এই দম্পতির। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা আত্মসাতের অপরাধে রাসেল ও শামীমাকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ২ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত এপ্রিলে পৃথক দুটি মামলায় রাসেল ও শামীমাকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন ঢাকার দুটি ভিন্ন আদালত। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকার আরেকটি আদালত এই দম্পতিকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন। গত নভেম্বরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেন রাসেল ও শামীমাকে। পাশাপাশি প্রত্যককে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয় আদালতের পক্ষ থেকে।

সাজাপ্রাপ্ত এসব মামলাসহ দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে দায়ের করা মামলায় আসামি হিসেবে অগণিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে রাসেল ও শামীমার বিরুদ্ধে। তাদের পরোয়ানার অন্তত ২৪টির নথি এসেছে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের হাতে। এসব পরোয়ানা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাইবার পিটিশনসহ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের বিভিন্ন আদালত থেকে আটটি, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি থানায় দায়েরকৃত মামলা থেকে চারটি, কাফরুল ও শাহজাহানপুর থানার একটি করে, খুলনার দুটি আদালত থেকে দুটি, কুমিল্লার বিভিন্ন আদালত থেকে দুটি, ফেনীর একটি, গাজীপুরের বিভিন্ন আদালত থেকে দুটি, গাজীপুর সদর থানার মামলা থেকে একটি, সুনামগঞ্জ সদর জোনের আমল গ্রহণকারী আদালত থেকে একটি এবং চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কোতয়ালি থানার একটি মামলায় এসব গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমন অন্তত দুই ডজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অর্ধডজন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড থাকার পরেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না রাসেল ও শামীমাকে। অনুসন্ধান বলছে, পলাতক ও আত্মগোপনে থেকেই আইনি প্রক্রিয়া সামাল দিচ্ছেন তারা। বিভিন্ন মামলার বাদীর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে ‘আউট অব কোর্ট সেটেলমেন্ট’ করছেন তারা। হাজিরা না দিলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে এমন কিছু মামলায় আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন তারা। এ ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা রাখছেন এই দম্পতি। গত ৫ আগস্টের পর থেকে তাদের আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয় মোহাম্মদ রাসেল। আত্মগোপনে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, কমেন্ট করাসহ ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তিনি। তার পরও আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে এবং পরোয়ানা তামিল করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না এই দম্পতিকে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের একাধিক পক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছেন রাসেল ও শামীমা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ইভ্যালির চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে ডজনের বেশি ওয়ারেন্ট থাকার পরও তারা কেন গ্রেপ্তার হচ্ছেন না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এ সময় তিনি বলেন, ‘যদিও তাদের প্রতারণার ঘটনায় বিভিন্ন ভুক্তভোগী মামলা করেছেন। ওই সব মামলায় তারা গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে আসেন। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো মামলায় ওয়ারেন্ট হয়েছে কিন্তু উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন নিয়েছেন। এমন ঘটনা ছাড়া পরোয়ানা নিয়ে কারো প্রকাশ্যে থাকার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে তারা সাজাপ্রাপ্ত। সাজা হলে আদালত অনেক সময় আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা তামিল করেন। সে ধরনের কোনো বিষয় থাকলে আর তারা দেশে অবস্থান করলে তাদের গ্রেপ্তারে অবশ্যই কাজ করবে র‌্যাব।’

এদিকে গ্রেপ্তার না হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তদবির অব্যাহত রেখেছেন আলোচিত এই দম্পতি। আগামী চার বছর ইভ্যালি কার্যালয় ও এর কর্মীদের নিরাপত্তা এবং নিজেদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার স্থগিতাদেশ চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন শামীমা। গত ৭ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এই চিঠি দেন তিনি। তবে চিঠিতে নিজেদের বর্তমান অবস্থান, ঠিকানা এবং যোগাযোগে কোনো ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা দেননি।

অন্যদিকে, ইভ্যালি পরিচালনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত পরিচালনা পর্ষদ এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। ২০২২ সালে শামীমা নাসরিনের মুক্তির পর এবং রাসেলের শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভায়রার নামে শেয়ার হস্তান্তরের পর একই বছরের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির নতুন পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত করে রায় দেন উচ্চ আদালত। সেই আদেশ অনুযায়ী শামীমা নাসরিনসহ তার বোন, বোনের জামাই, যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নন-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এমন দুই কর্মকর্তা এবং ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের একজন প্রতিনিধি নিয়ে এই বোর্ড গঠন করতে বলা হয়, বর্তমানে এই বোর্ডের কার্যক্রম নেই।

স্বতন্ত্র পরিচালক হয়ে ওই বোর্ডে সদস্য ছিলেন ই-ক্যাবের সাবেক সহসভাপতি সাহাব উদ্দিন শিপন। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের মার্চেই আমি পদত্যাগ করি। এরপর ইভ্যালি কীভাবে চলছে জানি না। শুরুতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় বোর্ড যেভাবে চলচিল, ইভ্যালি যেভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল; তাতে গ্রাহকদের অর্থ হয়তো ফেরত দেওয়া যেত, কিন্তু এখন আর সেটি সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’ রাসেল-শামীমা দম্পতির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সাজার আদেশ সম্পর্কে সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘এটা যেহেতু আদালতের বিষয়, সেটি যথাযথ কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। তবে কিছু রায় যেহেতু হয়েছে, রায়ের বাস্তবায়ন হওয়াই আইনসম্মত।’

জানা যায়, ২০২২ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া দুজন প্রতিনিধির বদলি হয়েছে। এরপর ইভ্যালির পরিচালনা পর্ষদে নতুন করে কোনো কর্মকর্তাকে প্রতিনিধির দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তারাও আর ইভ্যালিতে প্রতিনিধি দিতে আগ্রহী নন। ইভ্যালিকে ‘ফেইলড কেইস’ হিসেবেই দেখছেন তারা। ইভ্যালির এই পুনরুত্থানের সময় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেলের প্রধান ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ সাঈদ আলী। সম্প্রতি তথ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়েছেন তিনি। ইভ্যালি প্রসঙ্গে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বদলির পরে ইভ্যালির অবস্থা কী জানি না। তবে যা মনে হচ্ছে, রাসেল ও শামীমা যেভাবে আত্মগোপনে আছেন, তাতে এই প্রতিষ্ঠান আর ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে হচ্ছে না।’

এসব বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করে রাসেলের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা হয় রূপালী বাংলাদেশের। আত্মগোপনে থাকা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও সাজা, পাওনাদারদের বকেয়া অর্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। তবে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই দেশে আছেন বলে দাবি করেন রাসেল।

জানতে চাইলে ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. তালেবুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ওয়ারেন্টের আসামিকে গ্রেপ্তার না করার কোনো সুযোগ নেই। ইভ্যালির চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে একাধিক ওয়ারেন্ট রয়েছে এবং তারা দ-প্রাপ্ত। তবে এই দম্পতি দেশে আছেন কি না- এ বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত নয়। যদি দেশে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে পুলিশ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে সক্রিয় হবে। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সব সময় গুরুত্বসহ কাজ করে।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!