বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল স্কোরলাইনের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো রূপ নেয় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং ফুটবলীয় সংস্কৃতির চিরন্তন লড়াইয়ে। আগামীকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ মাঠে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড এবং ক্রোয়েশিয়া, আর এই ম্যাচকে ফুটবলপ্রেমীরা কেবল একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ হিসেবে দেখছেন না, বরং দেখছেন দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ হিসেবে। এই ম্যাচে একদিকে যেমন রয়েছে গতি, আধুনিক প্রেসিং এবং প্রমিজিং তারুণ্যে ঠাসা ইংল্যান্ডের সুপার টিম; অন্যদিকে ক্লান্তিহীন ফুসফুস, ইস্পাতকঠিন স্নায়ু এবং প্রজ্ঞাবান অভিজ্ঞতায় মোড়ানো ক্রোয়েশিয়ার লড়াকু বাহিনী। এই লড়াইয়ের পরতে পরতে যেমন জড়িয়ে আছে ট্যাকটিক্সের আধুনিকতম সমীকরণ, তেমনই নেপথ্যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে অতীত নস্টালজিয়া ও প্রতিশোধের তীব্র বারুদ।
অতীত নস্টালজিয়া
ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া; এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানেই ফুটবলের ডায়েরি থেকে পুরোনো কিছু পাতা উল্টে নেওয়া। দুই শিবিরের খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের মনে এখনো টাটকা হয়ে আছে ২০১৮ বিশকাপের মস্কোর সেই লুঝনিকি স্টেডিয়ামের স্মৃতি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ট্রিপিয়ারের ফ্রি-কিক থেকে এগিয়ে গিয়েও অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় ইভান পেরিসিক এবং মারিও মাঞ্জুকিচের গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ইংল্যান্ডের। ইটস কামিং হোম সেøাগানে মুখরিত ইংলিশদের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নকে নিষ্ঠরভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ক্রোয়াটদের লড়াকু মানসিকতা। সেই হার ইংলিশ ফুটবলের সমকালীন ইতিহাসে গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।
তবে থ্রি লায়ন্সরা সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিতে পেরেছিল ইউরো ২০২১-এর গ্রুপ পর্বে, যেখানে রহিম স্টার্লিংয়ের একমাত্র গোলে ক্রোয়েশিয়াকে পরাজিত করে তারা। আগামীকালের ম্যাচটি তাই কেবল গ্রুপ পর্বের ৩ পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি ইংল্যান্ডের জন্য ২০১৮ সালের ক্ষতের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ, আর ক্রোয়েশিয়ার জন্য ইউরো ২০২১-এর পুনরাবৃত্তি রুখে দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুত্থানের সুযোগ।
ট্যাকটিক্যাল ব্যবচ্ছেদ
মাঠের ভেতরের রণকৌশলে এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন দর্শনের চূড়ান্ত পরীক্ষা। গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ইংল্যান্ড এখন খেলছে অত্যন্ত আধুনিক, গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল। হ্যারি কেইনের নিখুঁত বিল্ড-আপ প্লে, বুকায়ো সাকা ও ফিল ফোডেনের উইংয়ের ক্ষিপ্রতা এবং জুড বেলিংহামের বক্স-টু-বক্স আগ্রাসন; সব মিলিয়ে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ যেকোনো ডিফেন্সকে ধুলিসাৎ করার ক্ষমতা রাখে। তাদের মূল শক্তি হলো হাই-প্রেসিং, অর্থাৎ প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকা অবস্থাতেই তাদের ওপর চড়াও হয়ে দ্রুত বল কেড়ে নেওয়া এবং কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়া।
বিপরীতে, ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল দর্শন পুরোপুরি মাঝমাঠ-কেন্দ্রিক এবং নিয়ন্ত্রণবাদী। লুকা মদ্রিচ, মাতেও কোভাসিচদের নিয়ে গঠিত ক্রোয়াট মিডফিল্ড বিশ্বের অন্যতম সেরা। তারা বল নিজেদের দখলে রেখে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে ভালোবাসে। ইংল্যান্ড যেখানে গতি দিয়ে ম্যাচ পকেটে পুরতে চাইবে, ক্রোয়েশিয়া সেখানে ম্যাচের গতি ধীর করে দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে। ইংলিশদের তরুণ রক্তকে কীভাবে নিজেদের অভিজ্ঞতার ফাঁদে ফেলে বোতলবন্দি করতে হয়, সেই শিল্পে ক্রোয়াটরা সিদ্ধহস্ত।
ডাকনামের নেপথ্যে
ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের মাঠের উত্তাপের পেছনে রয়েছে দুই দেশের গভীর ফুটবল সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধ, যা প্রতিফলিত হয় তাদের ডাকনামের মধ্য দিয়ে। ইংল্যান্ড দলকে বলা হয় ‘থ্রি লায়ন্স’। তিনটি সিংহের প্রতীকটি মূলত দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের শাসনামল থেকে ব্রিটিশ রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ। ফুটবল মাঠে এই ‘থ্রি লায়ন্স’ পরাক্রম, বীরত্ব এবং ঐতিহ্যের অহংকারকে ধারণ করে। ইংলিশ খেলোয়াড়দের জার্সিতে থাকা এই লোগোটি তাদের মনে করিয়ে দেয় বিশাল ফুটবলীয় সাম্রাজ্যের দায়বদ্ধতা, যা অনেক সময় তাদের ওপর বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপও তৈরি করে।
অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলকে ডাকা হয় ‘ভ্যাট্রেনি’, যার বাংলা অর্থ ‘অগ্নিশিখা’। নব্বইয়ের দশকে বলকান যুদ্ধের পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ক্রোয়েশিয়ার জন্য ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি ছিল বিশ্বদরবারে নিজেদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশের প্রধান হাতিয়ার। জার্সির লাল-সাদা দাবাড়ুর ছক এবং ‘ভ্যাট্রেনি’ নামটির পেছনে রয়েছে দেশপ্রেমের তীব্র আগুন এবং যেকোনো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার অদম্য জেদ।
শেষ অঙ্কের স্নায়ুযুদ্ধ
যখন রাজকীয় অহংকার আর মাঠের ভেতরের অগ্নিশিখা মুখোমুখি হয়, তখন সেখানে বাড়তি উত্তাপ ছড়ানোই স্বাভাবিক। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা যেখানে শৈশব থেকেই বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রমিয়ার লিগের জৌলুসের মধ্য দিয়ে বড় হন, ক্রোয়াটদের শক্তির উৎস সেখানে একাত্মতা এবং যুদ্ধোত্তর সংকট থেকে উঠে আসা ইস্পাতকঠিন মানসিকতা। কাগজে-কলমে তারুণ্য আর গতির শক্তিতে ইংল্যান্ড হয়তো কিছুটা এগিয়ে থাকবে, তবে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়াকে হেয় করার ভুল সাউথগেট নিশ্চয়ই করবেন না। স্টেডিয়ামের মহাদ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত কারা জয়ী হবে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে ফুটবল বিশ্ব।

