প্রথম ম্যাচে খারাপ খেলার পর সবার সমালোচনায় পড়েন তিনি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ডেড হর্স কি আর চলতে পারে!, কিংবা তার সময় শেষ। আরও কত কি! কেউ তো বলেছেন, তিনি এখন শুধুই একটি নাম, একটি ব্র্যান্ড, যার ঝলকানি আছে, কিন্তু আলো নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের ঝড় বয়ে গেছে। টেলিভিশনের টকশোতে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ তো এতদূরও বলেছেন, পর্তুগালের শুরুর একাদশে তার আর জায়গা হওয়া উচিত নয়।
যে মানুষটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বফুটবলকে নিজের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছেন, যিনি একের পর এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেই যেন এক ম্যাচের ব্যর্থতায় বাতিলের খাতায় ফেলে দিতে চেয়েছিল অনেকে। কিন্তু তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নায়করা কখনো সরলরেখায় এগিয়ে যান না। তাদের পথের বাঁকে বাঁকে থাকে সমালোচনা, সংশয়, ব্যর্থতা এবং প্রত্যাবর্তনের অদম্য গল্প। আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো? তিনি তো প্রত্যাবর্তনেরই আরেক নাম। খেলাটা তখন মাত্র শেষ হয়েছে। সম্প্রচার ক্যামেরা খুঁজে নিল তাকে। স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শকের উল্লাসের মাঝেও তার মুখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি, একরাশ আত্মবিশ্বাস। আর তিনি যে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জানান দিলেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক।
এই তিনটি শব্দ যেন শুধুই একটি ম্যাচের প্রতিক্রিয়া নয়। এটি ছিল সব সমালোচনার বিরুদ্ধে কঠিন জবাব। এটি ছিল সময়ের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। এটি ছিল তাদের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া এক তীর, যারা ভেবেছিল রোনালদোর গল্প শেষ।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, আমেরিকার টেক্সাসের হাউস্টনে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে যেন বাংলা গানের একটি লাইন নতুন অর্থে ফিরে আসে,
‘এভাবেও ফিরে আসা যায়,
এভাবেও ফিরে আসা যায়...!’
সত্যিই তো, এভাবেও ফিরে আসা যায়।
হ্যাঁ, ফিরে আসা যায়। সমালোচনার পাহাড় ডিঙিয়ে, বয়সের দেয়াল ভেঙে, ব্যর্থতার ধুলো ঝেড়ে আবারও আলোয় ফিরে আসা যায়।
ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল রোনালদোর জন্য এক দুঃস্বপ্ন। পুরো ম্যাচজুড়ে তাকে যেন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। বল পেয়েছেন কম, আক্রমণে প্রভাব ফেলতে পারেননি, দলকেও এগিয়ে নিতে পারেননি। ম্যাচ শেষে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বলা হয়, তিনি আর আগের মতো নেই। ভক্তরা যেন গানের সুরে সুরে বলেছেন-
‘তুমি আর নেই সে তুমি!’
কিন্তু রোনালদো কখনোই বাইরের কথায় নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেন না। তিনি সবসময় নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনেছেন। সেই কণ্ঠস্বরই হয়তো তাকে বলেছিল, ‘অপেক্ষা কর, সময় তোমার ইশারায় চলবে।’ আর সেই সময় এলো হাউস্টনের সবুজ ঘাসে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে।
ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিট। ডান প্রান্ত থেকে হোয়াও ক্যানসেলোর বাড়ানো বল। এক মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ, তারপর ডান পায়ের বজ্রগতির শট। বল জড়িয়ে গেল জালে। স্টেডিয়াম গর্জে উঠল। আর রোনালদো? দুই হাত ছড়িয়ে উদযাপন করলেন, যেন পৃথিবীকে বলছেন, ‘আমি এখনো এখানে আছি।
এই গোল ছিল না শুধুই একটি গোল। এটি ছিল এক প্রতিবাদ। এটি ছিল নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা। এই গোলের মাধ্যমে তিনি হয়ে গেলেন ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়, যিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করেছেন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ডও নিজের করে নিলেন। আর কিছুক্ষণ পরই যোগ করলেন আরও একটি গোল। ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠিয়ে বিশ্বকাপে পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসে পড়লেন তিনি।
রেকর্ড? রোনালদোর জন্য এটি যেন প্রতিদিনের ব্যাপার। কিন্তু এই ম্যাচের সৌন্দর্য রেকর্ডে নয়, সৌন্দর্য ছিল তার মানসিকতায়। পুরো ম্যাচজুড়ে তাকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি যেন নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি শট যেন বলে দিচ্ছিল, ‘আমি হার মানতে আসিনি।’এটাই তো রোনালদো।
তিনি সবসময় জেদি। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জেদ, সেরা হওয়ার জেদ, কখনো হাল না ছাড়ার জেদ। আর এই জেদের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় পর্তুগালের লিসবনের সেই ছোট্ট বাড়িতে, যেখানে তিনবেলা খাবার জোগাড় করাও ছিল কঠিন। ছোটবেলায় দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মাত্র বারো বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। নতুন শহর, নতুন জীবন, একাকিত্ব আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে প্রতিদিন। অনেকেই সেই বয়সে ভেঙে পড়ত। কিন্তু রোনালদো ভাঙেননি। বরং প্রতিটি কষ্টকে তিনি শক্তিতে পরিণত করেছেন। সেই কারণেই হয়তো তিনি নিজের সম্পর্কে এতটা আত্মবিশ্বাসী। অনেকেই এটিকে অহংকার বলেন। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে আছে হাজারো ত্যাগ, অগণিত অশ্রু আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ইতিহাস। তিনি নিজেকে সেরা বলেন, কারণ তিনি জানেন সেরা হওয়ার জন্য কতটা মূল্য দিতে হয়েছে।
এ কারণেই হয়তো বয়স তাকে থামাতে পারে না। সময় তাকে ধীর করেছে, কিন্তু থামাতে পারেনি। সমালোচনা তাকে আঘাত করেছে, কিন্তু ভাঙতে পারেনি। ব্যর্থতা তাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু হারাতে পারেনি।
তবে এই ম্যাচেও তিনি নিখুঁত ছিলেন না। দ্বিতীয় গোলের পর হ্যাটট্রিক করার জন্য দীর্ঘ সময় পেয়েছিলেন। কয়েকটি সহজ সুযোগও এসেছিল। কিন্তু হয়নি। তাতে কী? চাঁদেরও তো কলঙ্ক আছে। তাই বলে কি চাঁদের আলো কমে যায়? ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গল্পও তেমনই। কিছু অপূর্ণতা আছে, কিছু ব্যর্থতা আছে, কিন্তু তা তার আলোকে ম্লান করার মতো নয়।
সময় বড় নির্মম। সে একদিন সবার কাছ থেকেই সবকিছু কেড়ে নেয়। গতি কেড়ে নেয়, শক্তি কেড়ে নেয়, যৌবন কেড়ে নেয়। কিন্তু কিছু মানুষের কাছ থেকে সে একটি জিনিস কখনো নিতে পারে না, সেটা স্বপ্ন।
রোনালদোর স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে। তার জেদ এখনো বেঁচে আছে। তার চোখে এখনো জ্বলছে নতুন কিছু জয়ের আগুন। হয়তো এ কারণেই কোটি কোটি মানুষ তাকে শুধু একজন ফুটবলার হিসেবে দেখে না। তারা তাকে দেখে অনুপ্রেরণা হিসেবে। কারণ তিনি শিখিয়েছেনÑ জীবনে পড়ে যাওয়া ব্যর্থতা নয়, পড়ে থেকে যাওয়াটাই ব্যর্থতা।
আর যারা উঠে দাঁড়াতে জানে, তাদের জন্য প্রত্যাবর্তনের দরজা সবসময় খোলা থাকে।
কারণ কিংবদন্তিরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা অপেক্ষা করেন। তারপর একদিন, ঠিক হাউস্টনের সেই রাতের মতো, পৃথিবীকে আবারও মনে করিয়ে দেন ‘আই অ্যাম ব্যাক’।

