সোনালি চুলের ক্রোয়াট মিডফিল্ডার যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন তার চোখের কোণে জমে থাকা জলবিন্দুতে প্রতিফলিত হচ্ছিল এক শতাব্দীর ফুটবলীয় মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়। অন্যদিকে, টরন্টোর সান্ধ্যকালীন আলোয় তখন অন্য এক মহাতারকার মুখে চওড়া হাসি, যার চোখে এখনো জ্বলছে বিশ্বজয়ের আদিম আকাক্সক্ষা। লুকা মদ্রিচ এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো; একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইউরোপ শাসন করা দুই সহযোদ্ধা, শুক্রবারের এই নাটকীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে একজনকে থামতেই হতো। মদ্রিচের থামার রাতে রোনালদোর এগিয়ে যাওয়ার এই গল্প কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের জয়-পরাজয় নয়, এ যেন দুই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নের পরম সত্য।
রুদ্ধশ্বাস মহাকাব্য
শুক্রবার টরন্টো স্টেডিয়ামে যে ফুটবলীয় নাটকের অবতারণা হয়েছিল, তা হয়তো কোনো কুশলী নাট্যকারের পক্ষেও লেখা অসম্ভব। প্রথমার্ধজুড়ে পর্তুগালের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার দোমিনিক লিভাকোভিচ। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ইভান পেরিসিচের গোলে যখন ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে যায়, তখন রবার্তো মার্তিনেজের দলের কপালে চিন্তার ভাঁজ। নাটকের তখনো অনেক বাকি ছিল। অফসাইডের কারণে একের পর এক গোল বাতিল, ভিএআরের চুলচেরা বিশ্লেষণ আর গোলপোস্টের নিচে দিয়োগো কস্তার অতিমানবীয় দেয়াল হয়ে ওঠায় ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক স্নায়ুযুদ্ধে।
অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পেনাল্টি থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ঠান্ডা মাথার স্পটকিক, যা কেবল পর্তুগালকে সমতায় ফেরায়নি, বরং বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সিআরসেভেনের প্রথম গোলের অধরা বৃত্তটি সম্পূর্ণ করেছে। আর যোগ করা সময়ে গনসালো রামোসের শূন্যে ভেসে আসা দুর্দান্ত হেড যখন ক্রোয়েশিয়ার জাল কাঁপিয়ে দিল, তখন নিশ্চিত হয়ে যায়, লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ রূপকথার এখানেই সমাপ্তি, আর রোনালদোর মহাযাত্রা সচল রইল শেষ ষোলোর মঞ্চে।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সোনালি দিন
আজকের এই বিদায় ও আবাহনের আবহ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই সোনালি দিনগুলোয়। রিয়াল মাদ্রিদের সেই ঐতিহাসিক থ্রি-পিট বা টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন এই দুজন। মাঝমাঠ থেকে লুকা মদ্রিচের নিখুঁত, জাদুকরী পাস আর বক্সে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সেই খুনে ফিনিশিং। এই যুগলবন্দি ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল বছরের পর বছর। মদ্রিচ ছিলেন সেই শান্ত, ধীরস্থির শিল্পী যিনি নেপথ্যে থেকে সুর বাঁধতেন, আর রোনালদো ছিলেন সেই চড়া সুরের গায়ক যিনি মঞ্চ মাতিয়ে আলো কেড়ে নিতেন।
ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে এসে এই দুই পরম বন্ধু যখন একে অপরের মুখোমুখি হলেন, তখন ফুটবল রোমান্টিকদের মন বিষাদে ভরে ওঠাটাই স্বাভাবিক ছিল। যে মদ্রিচ ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে রূপকথার মতো ফাইনালে তুলে ব্যালন ডি’অর জিতে রোনালদো-মেসির একচ্ছত্র রাজত্বে হানা দিয়েছিলেন, কাল তার জাদুকরী পায়ের শেষ নাচ দেখে ফেলল বিশ্বমঞ্চ। তিনি থামলেন, বুকভরা আক্ষেপ আর এক বুক গৌরব নিয়ে।
রোনালদোর নতুন দিগন্ত
পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারে ট্রফির কোনো অভাব নেই। ইউরো জয় থেকে শুরু করে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সব রেকর্ডই তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে। কিন্তু একটা খটকা বরাবরই তার নামের পাশে জুড়ে দেওয়া হতো, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো গোল নেই তার। ৩ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ম্যাচ রোনালদোকে মুক্ত করল সেই অপবাদ থেকে। ৬৪ মিনিটে ভিএআরের কল্যাণে পাওয়া পেনাল্টি থেকে যখন তিনি বল জাল পাঠালেন, তখন সেটি কেবল ১-১ সমতাই আনেনি, বরং ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বহু বছরের এক মানসিক বাধা।
চলতি আসরে এটি তার তৃতীয় এবং বিশ্বমঞ্চে সব মিলিয়ে ১১তম গোল। চল্লিশ পাড় করা বয়সেও পেনাল্টি নেওয়ার সময় তার চোখের সেই একাগ্রতা প্রমাণ করে, কেন তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। রোনালদো কেবল গোল করেননি, রবার্তো মার্তিনেজেরুণ চার পরিবর্তনের পর যখন দলের কৌশলে বদল আসে, তখন অধিনায়ক হিসেবে দলকে ধরে রেখেছিলেন শক্ত হাতে। শেষদিকে যখন তাকে তুলে নেওয়া হয়, তখনো সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে তরুণদের যেভাবে উদ্বুদ্ধ করছিলেন, তা ছিল প্রকৃত সেনাপতির রূপ।
লা ফুরিয়া রোজার মুখোমুখি
ক্রোয়েশিয়া অধ্যায় এখন অতীত। পর্তুগালের সামনে এখন আরও বড়, আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। আগামী ৬ জুলাই শেষ ষোলোর মহারণে তাদের মুখোমুখি হতে হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের। যে স্পেন অস্ট্রিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে, তাদের তরুণ ও গতিময় ফুটবলের বিরুদ্ধে পর্তুগালের এই রক্ষণাত্মক ত্রুটিগুলো বড় ভয়ের কারণ হতে পারে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের টিকিটাকার নতুন সংস্করণের বিপক্ষে রোনালদোদের মাঝমাঠ ও রক্ষণকে হতে হবে আরও নিরেট।
রোনালদো কতদূর যাবেন? এই প্রশ্নটি এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ। স্পেনের বিরুদ্ধে ম্যাচটি কেবল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, এটি রোনালদোর জন্য নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার আরও একটি পরীক্ষা। রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সুবাদে স্প্যানিশ ফুটবল সংস্কৃতি রোনালদোর নখদর্পণে। রামোস, লেয়াও আর ব্রুনো ফার্নান্দেসদের নিয়ে গঠিত এই পর্তুগিজ স্কোয়াডটি নিঃসন্দেহে ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই এক একটি ফাইনাল। স্পেনের তরুণ তুর্কিদের গতিকে রুখে দিয়ে রোনালদো কি পারবেন তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটিকে অমর করে রাখতে?
মহাজ্যোতির অবসান
লুকা মদ্রিচ যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, ফুটবলপ্রেমীরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছেন এই শতাব্দীর অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারকে। তার বিদায় ফুটবলকে কিছুটা হলেও দরিদ্র করে দিল। কিন্তু পর্তুগালের ড্রেসিংরুমে এখন আনন্দের চেয়েও বেশি রয়েছে সতর্কতার হাওয়া। রোনালদো জানেন, মদ্রিচের বিদায় তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সময়ের নিষ্ঠুরতার কথা। তার নিজেরও এটি শেষ বিশ্বকাপ।
এক বন্ধু থেমে গেছেন টরন্টোর ট্র্যাজেডিতে, অন্য বন্ধু বুক চিতিয়ে লড়ছেন। পর্তুগিজ যুবরাজের এই অন্তিম যাত্রা স্পেনের বাধা পেরিয়ে, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল হয়ে লুসাইল বা মারাকানার মতো কোনো এক ফাইনালে গিয়ে ঠেকবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত ফুটবল বিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে এক বিষাদ সিন্ধুতে, যেখানে মদ্রিচের বিদায়ের সুর বেজে উঠছে, আর রোনালদো সেই সুরে তাল মিলিয়ে নিজের অমরত্বের খোঁজে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছেন।

