× UCB Sticker Card
বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৭:০৩ এএম

শতাব্দীর সেরা ফুটবলীয় যুদ্ধ

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৭:০৩ এএম

শতাব্দীর সেরা ফুটবলীয় যুদ্ধ

বিশ্বকাপ ফুটবলের সুদীর্ঘ বৈচিত্র্যময় ইতিহাসে কিছু ম্যাচ শুধু পরবর্তী রাউন্ডে উন্নীত হওয়ার লড়াই হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা রূপ নেয় সংস্কৃতির গভীর সংঘাত এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। ১৬ জুলাই আটলান্টার আটলান্টা স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড ম্যাচটি হতে যাচ্ছে তেমনই একটি ম্যাচ। এই দুই দল পরস্পর মুখোমুখি হলে সেখানে কেবল দলের এগারোজন করে খেলোয়াড় অবতীর্ণ হবেন না, বরং তাদের সঙ্গে এসে ভর করবে বিগত ছয় দশকের পুঞ্জীভূত আবেগ, বিতর্ক এবং অমীমাংসিত রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া। সুইজারল্যান্ডকে পরাস্ত করে আর্জেন্টিনার শেষ চারে আগমন এবং অপর প্রান্ত থেকে নরওয়েকে হারিয়ে ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে পা রাখার সমীকরণ মিলিয়ে আটলান্টিকের দুই পাড়ের ভক্তদের মাঝে যে প্রবল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার মূল উৎস নিহিত রয়েছে দল দুটির ঐতিহাসিক বৈরিতার গভীরে। ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে যে ৫ বার এই দুই পরাশক্তি মুখোমুখি হয়েছে, সেখানে পরিসংখ্যানের দাঁড়িপাল্লায় ৩-১, ১-০ এবং ১-০ গোলের তিনটি জয়ে ইংল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, ১৯৮৬ সালের ২-১ কিংবা ১৯৯৮ সালের টাইব্রেকারের স্নায়ুক্ষয়ী জয় আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় লোকগাথায় অমরত্ব লাভ করেছে। দীর্ঘ বিরতির পর, সামনের ম্যাচটি তাই কেবল ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াই নয়, বরং শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবলীয় কাব্যের নতুন এবং আধুনিকতম সংস্করণ।

এই চিরন্তন বৈরিতার ঐতিহাসিক শিকড়টি প্রোথিত রয়েছে ১৯৬৬ সালের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনালে, যা ফুটবল খেলার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণকেই চিরতরে বদলে দিয়েছিল। আর্জেন্টিনার তৎকালীন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের ঐতিহাসিক লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনাটি মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও তিক্ততার জন্ম দেয়। পশ্চিম জার্মান রেফারির দেওয়া নির্দেশাবলীর ভাষা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে রাত্তিনের মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানো এবং প্রতিবাদস্বরূপ তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য সংরক্ষিত লাল গালিচায় গিয়ে বসে পড়ার দৃশ্য আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আদিম প্রতিবাদের স্মারক। ম্যাচ শেষে ইংলিশ ম্যানেজার আলফ রামসের বিতর্কিত মন্তব্য এবং নিজের দলের খেলোয়াড়দের জার্সি বদল করতে নিষেধ করার ঘটনাটিকে লাতিন আমেরিকার এই দেশটি ‘শতাব্দীর সেরা চুরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তবে এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভের মাঝেই হয়েছিল প্রশাসনিক বিবর্তন, কারণ রাত্তিনের সেই ভাষার জটিলতা ও বিভ্রান্তি থেকেই পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম প্রবর্তনের পথ সুগম হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের মাঠের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ভূ-রাজনীতি এবং ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রীয় অহমিকার জটিল সমীকরণ। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধ, যা দক্ষিণ আটলান্টিকের বুকে মাত্র ৭৪ দিনে প্রায় নয়’শ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, তা দুই দেশের সাধারণ নাগরিক ও ফুটবলারদের মনস্তত্ত্বে গভীর স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। ফলে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন এই দুই দল পুনরায় মুখোমুখি হয়, সেটি আর কেবল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না, বরং তা রূপ নিয়েছিল যুদ্ধের মাঠের প্রতীকী প্রতিশোধের মঞ্চে। মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের ঐতিহাসিক ম্যাচে ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ফুটবলের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রূপ প্রদর্শন করেছিলেন। প্রথমত, পিটার শিল্টনের চোখের সামনে হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে তৈরি করা সেই কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ যেমন ছিল প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার চতুর কৌশল, দ্বিতীয়ত, তেমনই এর ঠিক চার মিনিট পর নিজেদের অর্ধাংশ থেকে বল ধরে একক দক্ষতায় পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে করা সেই ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ছিল বিশুদ্ধ নান্দনিকতার চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ। ম্যারাডোনা পরবর্তীতে তার আত্মজীবনীতে অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, সেই জয়টি ছিল ফকল্যান্ডস যুদ্ধে নিহত স্বদেশের তরুণদের আত্মত্যাগের প্রতীকী উপশম, যা কোনো সাধারণ ফুটবল দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি আস্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে গণ্য হয়েছিল।

ফুটবলের এই বহুমাত্রিক নাটকে খলনায়ক ও নায়কের যুগপৎ চরিত্রে ডেভিড বেকহ্যামের আবির্ভাব এই দ্বৈরথকে আরও বেশি মানবিক এবং নাটকীয় করে তোলে। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সেন্ট এতিয়েনের মাঠে মাইকেল ওয়েনের সেই অবিশ্বাস্য একক গোলটি ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হতে পারত, কিন্তু ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে মৃদু শারীরিক সংস্পর্শের পর মাঠের উত্তেজনায় বেকহ্যামের এক মুহূর্তের ভুল পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। লাল কার্ড দেখে বেকহ্যামের মাঠ থেকে বিদায় নেওয়া এবং দশজন নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেও টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের ৪-৩ গোলের পরাজয় ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও সমর্থকদের চোখে বেকহ্যামকে এক রাত্রিতে খলনায়কে রূপান্তরিত করেছিল। অথচ চার বছর পর, ২০০২ সালের সাপোরা গম্বুজে পেনাল্টি থেকে নেওয়া ঠান্ডা মাথার শটে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে যখন বেকহ্যাম নিজের দেশকে নকআউট পর্বে নিয়ে যান এবং আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় করে দেন, তখন সেই একই জনতা তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। এই উত্থান-পতনই প্রমাণ করে যে, এই দুই দেশের ফুটবল ম্যাচ মানেই চরিত্রের দ্রুত বদল এবং মাঠের ভেতরের তীব্র মানসিক চাপ।

জাপানের সেই সাপোরা দ্বৈরথের পর দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের আর কোনো দেখা হয়নি। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন এবং আর্কাইভের ধুলোবালি ঘাঁটাঘাঁটি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে দুই দেশের ফুটবলপ্রেমীদের। অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আটলান্টার আধুনিক স্টেডিয়ামে, যেখানে এই ঐতিহাসিক মহাকাব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রথমবারের মতো এসে দাঁড়িয়েছেন লিওনেল মেসি। আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এই ফুটবল জাদুকর তার দীর্ঘ বর্ণিল ক্যারিয়ারে আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রায় প্রতিটি শিখর স্পর্শ করলেও, বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা এতদিন তার ঝুলিতে ছিল না। এই সেমিফাইনালটি তাই মেসির ব্যক্তিগত ক্যানভাসের সেই শেষ শূন্যস্থানটি পূরণ করার সুবর্ণ সুযোগ, যেখানে তিনি সুপ্রাচীন এই রূপকথার মহানায়ক হিসেবে মাঠে নামবেন। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে মেসির উপস্থিতি আর্জেন্টিনার ফুটবল আবেগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তাদের ঐতিহ্যবাহী মুচাচোস গানের সুরে সুর মেলাবে, যে গান একাধারে ম্যারাডোনা ও মেসির বন্দনা করে এবং একই সঙ্গে ফকল্যান্ডসের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

এবার আটলান্টার সেমিফাইনালে দুই দলের শক্তির ভারসাম্য এবং বর্তমান ফর্ম বিশ্লেষণ করলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠের সৃজনশীলতা এবং আক্রমণভাগে মেসির চূড়ান্ত পাসিংয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডের বর্তমান প্রজন্মের আধুনিক, গতিশীল এবং ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের তীব্র সংঘাত দেখা যাবে। ম্যারাডোনা কিংবা বেকহ্যামের সেই যুগ আজ অতীত, রাজনৈতিক তিক্ততার তীব্রতাও হয়তো সময়ের নিয়মে অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে, কিন্তু এই দুই দেশের ফুটবলীয় আভিজাত্য এবং ঐতিহ্যের অহংকার বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। ইংল্যান্ডের তরুণ দলটির সামনে যেমন রয়েছে অতীত দুঃখের স্মৃতি মুছে ফেলে নতুন বিজয়ের ইতিহাস রচনার সুযোগ, তেমনি আর্জেন্টিনার সামনে রয়েছে তাদের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখার চূড়ান্ত পরীক্ষা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!