ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

সোনালি ট্রফির ট্র্যাজিক নায়করা

 রুহুল আমিন ভূঁইয়া
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

বিজয়ীদের উল্লাসধ্বনিতে মুখরিত ফুটবল ইতিহাসের রাজকীয় মঞ্চে আলোকচ্ছটা বরাবরই শোষিত হয় সোনালি ট্রফি স্পর্শ করা হাতগুলোর দ্বারা। বিজয়ের এই নির্মম ব্যাকরণে ইতিহাস কেবল প্রথম স্থানাধিকারীকেই মনে রাখে বলে যে প্রচলিত ধারণা, ফুটবল তার সুদীর্ঘ রোমান্টিক পথচলায় বারবার সেই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। কিছু পরাজয় থাকে যা যেকোনো বিজয়ের চেয়েও বেশি প্রদীপ্ত, কিছু ট্র্যাজেডি থাকে যা ট্রফি ক্যাবিনেটের উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। ট্রফির শূন্যতা যাদের নান্দনিক আবেদনকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি, বরং যাদের অপূর্ণতাই তাদের করে তুলেছে চিরন্তন, ফুটবল ইতিহাসের সেই অমর ট্র্যাজিক নায়কদের গল্প এটি।

এই বিষাদময় কাব্যের প্রথম অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপের মিউনিখে। ইয়োহান ক্রুইফ এবং তার কমলা জার্সিধারী নেদারল্যান্ডস দল সেবার বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল টোটাল ফুটবল নামক এক পরাবাস্তব দর্শনের সঙ্গে। যেখানে মাঠের জ্যামিতিক সীমানা ভেঙে একজন ডিফেন্ডার মুহূর্তে পরিণত হতেন ফরোয়ার্ডে, আর ফরোয়ার্ড নেমে আসতেন রক্ষণের প্রয়োজনে। ক্রুইফের জাদুকরী ড্রিবলিং ও ফুটবলীয় মস্তিস্কের ওপর ভর করে ডাচরা যখন ফাইনালে স্বাগতিক জার্মানির মুখোমুখি হয়, তখন ফুটবল রোমান্টিকদের ধারণা ছিল শিল্পেরই জয় হতে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠের নিষ্ঠুর বাস্তবতা ও জার্মানদের নিখুঁত যান্ত্রিক ফুটবলের কাছে ২-১ গোলে চূর্ণ হয় ডাচ স্বপ্ন। ক্রুইফ সেদিন ট্রফি ছূঁতে পারেননি, কিন্তু মিউনিখের ভেজা ঘাসে তিনি রেখে গিয়েছিলেন এমন এক ফুটবলীয় দর্শন, যা পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে। চ্যাম্পিয়ন জার্মানির চেয়েও রানার্স-আপ নেদারল্যান্ডস আজও বিশ্ব ফুটবলে বেশি বন্দিত, কারণ তারা ট্রফি জেতেননি, তারা ফুটবলকে নতুন ভাষা দিয়েছিলেন।

শিল্পের এই ট্র্যাজিক অপূর্ণতার পরবর্তী বেদনাবিধুর উদাহরণ ১৯৮২ সালের স্পেনের মাটিতে জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও এবং টোনিনহো সেরেজোর সমন্বয়ে গড়া ব্রাজিলের কিংবদন্তি দল। ফুটবল ইতিহাসে যদি কোনো দলকে সুন্দর ফুটবলের শেষ প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করতে হয়, তবে তা ১৯৮২ সালের ব্রাজিল। সক্রেটিসের বুদ্ধিমত্তা ও জিকোর পায়ের ছোঁয়ায় মাঠের ভেতর তারা যে সাম্বা সুর তুলেছিলেন, তা ছিল বিশুদ্ধ আনন্দ ও ফুটবলের চরম নান্দনিকতার মেলবন্ধন। কিন্তু স্পেনের সারিয়া স্টেডিয়ামে ইতালির পাওলো রসির হ্যাটট্রিক ও রক্ষণাত্মক কাতেনাচিও কৌশলের কাছে ৩-২ গোলে স্তব্ধ হয়ে যায় সেই লাতিন ছন্দ। সক্রেটিস ও জিকোর সেই দলটির বিদায়কে ফুটবল বিশ্লেষকেরা আখ্যায়িত করেছিলেন ‘যেদিন ফুটবল তার সৌন্দর্য হারিয়েছিল’ বলে। ট্রফি ছাড়াই সেই ব্রাজিল দল আজও ফুটবলবিশ্বের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে রোমান্টিক দল হিসেবে মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায় অক্ষত রয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে কাপ জেতার চেয়ে হৃদয়ে দাগ কেটে যাওয়া অনেক বেশি মূল্যবান।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ফুটবলের যুগে এই বিষাদময় পতাকা বয়ে নিয়ে চলেছেন ক্রোয়েশিয়ার মহানায়ক লুকা মদ্রিচ। ২০১৮ সালের রাশিয়ার মাটিতে ক্ষুদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে মদ্রিচ যখন মাঠে নেমেছিলেন, তখন তার শান্ত চোখ আর মাঝমাঠের ক্লান্তিহীন নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাসীকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। একের পর এক নকআউট ম্যাচে অতিরিক্ত সময় এবং টাইব্রেকারের স্নায়ুক্ষয়ী বৈতরণী পার হয়ে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন এই জাদুকর। ফাইনালে ফ্রান্সের গতির কাছে ৪-২ গোলে হারার পর, মস্কোর প্রবল বৃষ্টির মধ্যে যখন মদ্রিচ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল ট্রফিটি হাতে নিচ্ছিলেন, তখন তার ভেজা চুল আর বিষণœ মুখাবয়ব ছিল আধুনিক ফুটবলের একটি শক্তিশালী ট্র্যাজিক দৃশ্য। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পরও মদ্রিচ যে সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন, তা কোনো বিশ্বজয়ী অধিনায়কের চেয়ে কম নয়। ট্রফি ক্যাবিনেটে সোনালি কাপের অনুপস্থিতি মদ্রিচের ফুটবলীয় অমরত্বকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ট্র্যাজিক নায়কের নাম সম্ভবত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ক্লাব ফুটবলের সমস্ত ট্রফি এবং পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জয়ের পরও, পর্তুগালের এই মহাতারকার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়ে রইল ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি। ২০১৬ সালের ইউরো জয় কিংবা দুই দশক ধরে পর্তুগিজ ফুটবলকে একাই টেনে নিয়ে যাওয়ার গৌরব সত্ত্বেও, বিশ্বকাপের মঞ্চে রোনালদোর গল্পটি বরাবরই বিষাদের রঙে রাঙানো। বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে মাঠ ছাড়ার সময় টানেল দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে রোনালদোর একাকী হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল যুগের অবসান এবং এক মহানায়কের করুণ বিদায়ের স্মারক। চলমান বিশ্বকাপেও পর্তুগালের সোনালি প্রজন্মের সঙ্গে তার শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের স্বপ্নটি আবারও ভেঙে গেল।