× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

এমবাপ্পে-কেইন যুদ্ধের অপেক্ষা

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

এমবাপ্পে-কেইন যুদ্ধের অপেক্ষা

বিশ্বকাপের গল্প মানেই শুধু ট্রফি জয়ের উল্লাস নয়; এর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অপূর্ণতার বেদনাও। কেউ স্বপ্ন পূরণ করে, কেউ স্বপ্নভঙ্গের ভার বুকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। তবু ফুটবল এমন এক খেলা, যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আশার আলো নিভে যায় না। সেই আলো নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে

মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তিÑ ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। শিরোপার মঞ্চে নয়, তবু মর্যাদার লড়াইয়ে এই ম্যাচের গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। সেমিফাইনালের পরাজয় দুই দলের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ফ্রান্স স্পেনের নিখুঁত দখলভিত্তিক ফুটবলের কাছে হার মেনে বিদায় নিয়েছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্বপ্ন রক্ষা করতে পারেনি। অথচ কয়েক দিন আগেও এই দুই দলকে নিয়েই ছিল বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় আলোচনা। এখন তাদের সামনে একটাই লক্ষ্যÑ শেষ ম্যাচে জয়, যাতে অন্তত বিশ্বকাপের বিদায়টা হয় হাসিমুখে।

ফ্রান্স : গতির ভেতর লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য, এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে দেখে মনে হয়েছে পাহাড়ি নদীর মতোÑ শান্ত থেকেও মুহূর্তেই ভয়ংকর হয়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। বল দখল করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা নয়, বরং প্রতিপক্ষের একটি ভুলকে পুঁজি করে বিদ্যুৎগতির আক্রমণই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই আক্রমণের প্রাণ কিলিয়ান এমবাপ্পে। আধুনিক ফুটবলে গতির সংজ্ঞা যেন তার নামেই লেখা। প্রতিপক্ষের দুই-তিনজন ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে কয়েক সেকেন্ডে গোলমুখে পৌঁছে যাওয়ার যে সামর্থ্য, সেটি খুব কম ফুটবলারের আছে। পুরো টুর্নামেন্টে এমবাপ্পে শুধু গোলই করেননি, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার ছিন্নভিন্ন করে সতীর্থদের জন্যও সুযোগ তৈরি করেছেন। তার প্রতিটি দৌড় গ্যালারিতে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

কিন্তু ফ্রান্সের ফুটবল শুধু এমবাপ্পে নির্ভর নয়। ডান প্রান্তে মাইকেল অলিসে ছিলেন নীরব শিল্পী। নিখুঁত ক্রস, চোখধাঁধানো থ্রু পাস এবং আক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণ করে তিনি ফরাসি ফুটবলে এনে দিয়েছেন সৃজনশীলতার নতুন মাত্রা। আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও দলের সাফল্যের অন্যতম স্থপতি হয়ে উঠেছেন তিনি।

রক্ষণে উইলিয়াম সালিবা যেন এক অদৃশ্য প্রাচীর। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকাররা যখন আক্রমণে ছুটে এসেছেন, তখন ঠান্ডা মাথায় সঠিক সময়ে ট্যাকল করে কিংবা পজিশন ঠিক রেখে তিনি ফ্রান্সকে রক্ষা করেছেন। আধুনিক সেন্টার-ব্যাকের যে বৈশিষ্ট্যÑ শক্তি, গতি ও বল নিয়ে খেলার দক্ষতা, তার সবকিছুই রয়েছে সালিবার মধ্যে।

ইংল্যান্ড : ধৈর্যের স্থপতি, কৌশলের কারিগর

ইংল্যান্ডের ফুটবল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছন্দে এগিয়েছে। তারা ঝড় তুলে ম্যাচ জেতার চেয়ে ধৈর্য ধরে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে বেশি বিশ্বাস করেছে। বলের দখল ধরে রেখে ধীরে ধীরে আক্রমণ সাজানো, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত প্রেসিং ছিল তাদের মূল শক্তি। এই দলের অভিজ্ঞতার প্রতীক হ্যারি কেইন। তিনি কেবল একজন স্ট্রাইকার নন, পুরো আক্রমণের পরিচালক। কখন বক্সে থাকতে হবে, কখন মাঝমাঠে নেমে এসে খেলা গড়তে হবেÑ সবকিছুই যেন তার ফুটবলবোধের অংশ। বড় ম্যাচে তার নেতৃত্ব ইংল্যান্ডকে সবসময় আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

মাঝমাঠে জুড বেলিংহ্যাম ছিলেন দলের স্পন্দন। নব্বই মিনিটজুড়ে নিরলস দৌড়, বল কেড়ে নেওয়া, আক্রমণ শুরু করা এবং প্রয়োজনে রক্ষণে নেমে আসাÑ সব ভূমিকায় সমান স্বচ্ছন্দ তিনি। অনেকেই তাকে এই প্রজন্মের সবচেয়ে পরিপূর্ণ মিডফিল্ডার বলে মনে করেন, আর এই বিশ্বকাপেও তিনি সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন।

সাকার ডানায় ইংল্যান্ডের স্বপ্ন : ডান প্রান্ত দিয়ে যখন বুকায়ো সাকা ছুটে ওঠেন, তখন মনে হয় বাতাসও যেন তার সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খায়। ছোট ছোট স্পর্শে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ওঠা, হঠাৎ গতি বাড়িয়ে বক্সে ঢুকে পড়া কিংবা নিখুঁত ক্রসে সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়াÑ এসবই তার স্বাভাবিক দক্ষতা। এই বিশ্বকাপে সাকার পায়ে ইংল্যান্ডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণের সূচনা হয়েছে। বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার যে আত্মবিশ্বাস, সেটি তাকে ইংল্যান্ডের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করেছে। রক্ষণে জন স্টোনস যেন অভিজ্ঞতার

আরেক নাম। চারপাশে চাপ বাড়লেও তার মুখে উদ্বেগের ছাপ দেখা যায় না। প্রতিপক্ষের আক্রমণ পড়ে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতা, নিখুঁত অবস্থান নির্বাচন এবং পেছন থেকে খেলা গড়ে তোলার দক্ষতা ইংল্যান্ডকে দিয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা। তার উপস্থিতি শুধু রক্ষণকেই শক্তিশালী করে না, পুরো দলকেই আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

দুই দর্শনের সংঘর্ষ : ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডÑ দুই দলের ফুটবল দর্শন যেন একই নদীর দুই তীর। ফ্রান্স বিশ্বাস করে গতি, সাহস এবং মুহূর্তের বিস্ফোরণে। প্রতিপক্ষের একটি ভুল দেখলেই তারা বজ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড অপেক্ষা করতে জানে। তারা ধৈর্য ধরে বলের দখল রাখে, প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে এবং সঠিক মুহূর্তে আঘাত হানে। তাই এই ম্যাচে শুধু দুই দল নয়, মুখোমুখি হবে দুটি ফুটবল দর্শনও। একদিকে এমবাপ্পের ঝড়ো গতি, অন্যদিকে স্টোনসের অভিজ্ঞতা; একদিকে অলিসের সৃজনশীলতা, অন্যদিকে বেলিংহ্যামের সর্বগ্রাসী উপস্থিতি। মাঝমাঠের প্রতিটি দ্বৈরথ, উইংয়ের প্রতিটি দৌড় এবং বক্সের প্রতিটি স্পর্শ বদলে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য। ব্রোঞ্জের পদক, কিন্তু সম্মানের মূল্য সোনার সমান অনেকেই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে গুরুত্বহীন মনে করেন। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস অন্য কথা বলে। এই ম্যাচই প্রমাণ করে, একটি দল পরাজয়ের পর কত দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারে। এটি শুধু একটি পদকের লড়াই নয়; এটি ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাস, সমর্থকদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং একটি সফল অভিযানের শেষ স্বাক্ষর। ফ্রান্সের জন্য এই ম্যাচ নতুন প্রজন্মের শক্তি দেখানোর সুযোগ। এমবাপ্পে, অলিসে কিংবা সালিবারা চাইবেন বিশ্বকাপ শেষ করতে জয়ের হাসি নিয়ে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কাছে এটি প্রমাণ করার মঞ্চ যে, তাদের ধারাবাহিক উন্নতি কাকতালীয় নয়; তারা সত্যিই বিশ্বফুটবলের অন্যতম শক্তি। শেষ বাঁশির পর যে গল্প বেঁচে থাকবে মিয়ামির রাত যখন ধীরে ধীরে গভীর হবে, স্টেডিয়ামের আলোয় তখন ফুটে উঠবে দুটি ভিন্ন অনুভূতি। একদল আনন্দে আলিঙ্গন করবে ব্রোঞ্জ পদক, আরেক দল নীরবে ভাববেÑ আর মাত্র একটি ধাপ এগোলেই হয়তো ফাইনাল। কিন্তু ফুটবল এমনই নির্মম, আবার তেমনি সুন্দরও। এখানে প্রতিটি হার শেখায়, প্রতিটি জয় নতুন স্বপ্ন দেখায়।

ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের এই লড়াই তাই কেবল একটি ম্যাচ নয়। এটি দুই ফুটবল-সভ্যতার অহংকার, দুই ভাঙা স্বপ্নের পুনর্জন্ম এবং শেষবারের মতো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দেওয়ার এক অনন্য মঞ্চ। হয়তো বিশ্বকাপের ট্রফি তাদের হাতে উঠবে না, কিন্তু একটি জয় প্রমাণ করে দিতে পারেÑ মহান দলগুলো শুধু শিরোপা জিতে ইতিহাস লেখে না; তারা পরাজয়ের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও নতুন কিংবদন্তির জন্ম দেয়। তাই ব্রোঞ্জের এই রাতকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ কখনো কখনো স্বর্ণের ট্রফির চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে হার না মানা মানুষের গল্প। আর সেই গল্প লিখতেই এবার একই মাঠে নামছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডÑ শেষবারের মতো, শেষ হাসির সন্ধানে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!