বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন একের পর এক দেশের পতাকা উড়ে, তখন মনে হয় প্রতিটি দলই যেন নিজস্ব ইতিহাস আর পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। কিন্তু সেই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেকটি গল্প একই শহরে জন্ম নেওয়া, একই রাস্তায় বেড়ে ওঠা, এমনকি কখনো একই মাঠে ফুটবলের হাতেখড়ি হওয়া দুই ফুটবলার আজ খেলছেন দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ সেই গল্পকেই নতুন আলোয় তুলে ধরেছে। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১,২৪৮ জন ফুটবলারের মধ্যে ৯৯ জনের জন্ম ফ্রান্সে। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র ২৩ জন খেলছেন ফ্রান্সের জার্সিতে। বাকি ৭৬ জন প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। এই পরিসংখ্যান শুধু বিস্ময় জাগায় না, বরং বলে দেয় ফ্রান্স আজ শুধু একটি জাতীয় দল নয়, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতিভার উৎস।
ফুটবল প্রতিভার এক অদম্য কারখানা
ফ্রান্স বহু বছর ধরেই ফুটবল প্রতিভা তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। দেশটির আধুনিক একাডেমি, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, দক্ষ কোচিং এবং স্থানীয় ক্লাব সংস্কৃতি ছোটবেলা থেকেই খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলে। ক্লেয়ারফঁতেনের মতো বিশ্বখ্যাত একাডেমি কিংবা প্যারিস, লিয়ঁ, মার্সেই ও লিলের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো প্রতিবছর অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরি করছে। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে ইউরোপের শীর্ষ লিগে জায়গা করে নেন, আবার অনেকেই নিজের পারিবারিক শিকড়ের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। জন্ম ফ্রান্সে, পরিচয় পূর্বপুরুষের দেশে
এই ৯৯ ফুটবলারের বড় অংশই অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তাদের বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদির জন্ম উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা বা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে। ফলে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী তারা পারিবারিক সূত্রে সেই দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার অধিকার পান। তাই বিশ্বকাপে দেখা যায়, ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া একজন ফুটবলার মরক্কো, আলজেরিয়া, সেনেগাল, ডিআর কঙ্গো কিংবা হাইতির জার্সিতে মাঠে নামছেন। জন্ম এক দেশে হলেও হৃদয়ের টান আর পারিবারিক ঐতিহ্য তাদের অন্য পতাকার নিচে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। প্যারিস বিশ্ব ফুটবলের প্রতিভার রাজধানী
ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই ৯৯ জন ফুটবলারের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি জন্মেছেন প্যারিস ও তার আশপাশের এলাকায়। বহুজাতিক সংস্কৃতি, ছোট ছোট স্ট্রিট ফুটবলের মাঠ, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এই অঞ্চলকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা প্রতিভার আঁতুড়ঘরে পরিণত করেছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিশ্বের আর কোনো মহানগর একসঙ্গে এত বেশি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি করতে পারেনি, যতটা করেছে বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চল।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের অদৃশ্য উপস্থিতি
ফ্রান্স হয়তো একটি দল নিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে, কিন্তু তাদের ফুটবল শিক্ষা ছড়িয়ে আছে আরও বহু দলের মধ্যে। আলজেরিয়া, হাইতি, সেনেগাল, ডিআর কঙ্গো, আইভরি কোস্টসহ বিভিন্ন দেশের দলে খেলছেন ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা ফুটবলাররা।
অর্থাৎ কোনো ম্যাচে ফ্রান্স মাঠে না থাকলেও, ফ্রান্সের ফুটবল দর্শন ও প্রশিক্ষণের ছাপ ঠিকই উপস্থিত থাকে। এ যেন বিশ্বকাপের প্রতিটি বড় ম্যাচেই ফ্রান্সের একটি নীরব উপস্থিতি।
বিশ্বায়নের ফুটবলে নতুন পরিচয়ের গল্প
আধুনিক বিশ্বে একজন মানুষের পরিচয় শুধু জন্মভূমি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। পরিবার, সংস্কৃতি, শিকড়, নাগরিকত্ব এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তÑ সব মিলিয়েই গড়ে ওঠে তার পরিচয়। ফুটবলও সেই পরিবর্তনের বাইরে নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের ৯৯ ফরাসি-জন্ম ফুটবলার দেখিয়ে দিয়েছেন, আজকের ফুটবল সীমান্তের চেয়ে অনেক বড়। এখানে একটি দেশের মাঠে জন্ম নেওয়া প্রতিভা আরেকটি দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রান্স শুধু একটি দল নয়, বিশ্ব ফুটবলের শক্তির উৎস : যদি শুধু জন্মস্থানের ভিত্তিতে একটি দল গঠন করা হতো, তাহলে ফ্রান্স অনায়াসেই দুটি বিশ্বমানের একাদশ মাঠে নামাতে পারত। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি শুধু মাঠে নয়, প্রতিভা তৈরির ক্ষেত্রেও ফ্রান্স।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই আরেকবার মনে করিয়ে দিল ফ্রান্স শুধু নিজের জন্য বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করে না; তারা পুরো বিশ্বের ফুটবলকেই সমৃদ্ধ করে। বিশ্বের নানা দেশের জার্সিতে ছড়িয়ে থাকা সেই ৯৯ ফুটবলার যেন একই শিকড় থেকে জন্ম নেওয়া ৯৯টি আলাদা গল্প, যাদের গন্তব্য ভিন্ন হলেও শুরুটা একই মাটিতে।

