ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

এআই হবে প্রোডাকশন টিম আর মানুষ হবে ডিরেক্টর

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫, ০৭:২৮ এএম

দুই হাজার পঁচিশ সালকে বলা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বছর। বিগত সময়ের সব রেকর্ড ভেঙে এ বছর দেশে প্রায় ৯৬ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়মিত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ও কার্যকর ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে এই প্রযুক্তি মানুষের চাকরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার। এআইয়ের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে কিংবা দুই হাজার ছাব্বিশ সালে এ প্রযুক্তির প্রভাব কোন দিকে যাবেÑএসব বিষয়ে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন ‘ডায়ানা হোস্টিং’ কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এবং জনপ্রিয় এআই কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিন রাফান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফান হোসাইন রাফি

কেমন আছেন? সার্বিকভাবে এআই কন্টেন্ট-এর বর্তমান অবস্থা কেমন?

আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি। আশা করি আপনিও ভালো আছেন। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, এআই কন্টেন্ট এখন এক্সপেরিমেন্টাল পর্যায় পেরিয়ে পুরোপুরি মেইনস্ট্রিম পর্যায়ে চলে এসেছে। আগে যেখানে এআই মূলত ফিল্টার বা সাধারণ টেক্সট তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন সেখানে সিনেমাটিক ভিডিও, ভয়েস, মিউজিক ও ডিজাইনÑ সবকিছুই দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি কপি-পেস্ট বা নি¤œমানের কনটেন্টের পরিমাণও বেড়েছে। ফলে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কনটেন্টের অথেন্টিসিটি বজায় রাখা এবং মানের দিক থেকে আলাদা করে দাঁড়ানো।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব শ্রমবাজারে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আপনি কী মনে করেন?

আতঙ্কটা রিয়েল, কিন্তু সত্যটা হলো, এআই মানুষের চাকরি শুধু খাবে না; অনেক কাজের রূপও বদলাবে। যারা আপস্কিল করবে না, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর যারা এআইকে কাজে লাগাতে শিখবে, তারা এগিয়ে যাবে। আমি বলি, এআই চাকরি নেবে না; এআই ব্যবহার করতে জানে এমন মানুষ চাকরি নেবে। তাই এখন দরকার স্কিল আপগ্রেড, রিস্কিলিং এবং নতুন ধরনের কাজের প্রস্তুতি।

এআই কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ভবিষ্যৎ কেমন বলে মনে করেন?

এআই কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ভবিষ্যৎ খুবই বড়। এখানে জিতবে তারা, যারা এআই-কে শুধু ‘বাটন চাপা ম্যাজিক’ হিসেবে না দেখে স্কিল-ভিত্তিক একটি প্রোডাকশন পাইপলাইন তৈরি করবে। এআই টুল বদলাবে, কিন্তু গল্প বলার ক্ষমতা, ব্র্যান্ড ভয়েস, ক্যামেরা সেন্স, এডিটিং সেন্সÑ এই দক্ষতাগুলোর ভ্যালু আরও বাড়বে। ভবিষ্যতে এআই হবে প্রোডাকশন টিম, আর মানুষ হবে ডিরেক্টর।

২০২৬ সালে এআইয়ের প্রধান পরিবর্তনগুলো কী হতে পারে এবং সেগুলো কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা দৈনন্দিন জীবনে কেমন প্রভাব ফেলবে?

২০২৬ সালে এআইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। প্রথমত, আরও রিয়েলিস্টিক ভিডিও ও ভয়েস জেনারেশন সম্ভব হবে, যেখানে খুব অল্প সময়েই সিনেমা-লেভেলের আউটপুট তৈরি করা যাবে। দ্বিতীয়ত, পার্সোনালাইজড এআই আরও শক্তিশালী হবে। এআই আপনার স্টাইল, ভাষা ও ব্র্যান্ড টোন শিখে আপনার মতো করেই কাজ করতে পারবে। তৃতীয়ত, রিয়েল-টাইম এআই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে; এডিটিং, সাবটাইটেল, কালার গ্রেডিং ও থাম্বনেইল তৈরি লাইভ বা অন-দ্য-ফ্লাই করা সম্ভব হবে। এ পরিবর্তনগুলোর প্রভাবে কনটেন্ট তৈরি আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে যাবে, তবে একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বহুগুণে বাড়বে। ফলে ভবিষ্যতে ভিউ বা অডিয়েন্সের মনোযোগ পাওয়া নির্ভর করবে শুধু টুলের ওপর নয়, বরং আইডিয়া, এক্সিকিউশন এবং দর্শকের ট্রাস্ট গড়ে তোলার ক্ষমতার ওপর।

এআই যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য বিশ্লেষণ ও কনটেন্ট সাজাতে পারবে, তখন মানুষের পেশাদার দক্ষতা ও চিন্তাভাবনার ভূমিকা কেমন হবে?

তখন মানুষের পেশাদার দক্ষতা ও চিন্তাভাবনার ভূমিকা কমবে না, বরং শিফট হবে। এআইয়ের  পরিসরকে অনেক বড় করবে, কিন্তু মানুষই ঠিক করবে কেন কনটেন্ট বানানো হচ্ছে, কার জন্য বানানো হচ্ছে এবং কী বার্তা পৌঁছাবে। ভবিষ্যতে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা থাকবে স্টোরিটেলিং, ইমোশন ও কালচারাল সেন্সে। পাশাপাশি এথিক্স ও জাজমেন্টের মতো বিষয়গুলোতেও মানুষের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। অডিয়েন্সকে বোঝা, ব্র্যান্ড ট্রাস্ট তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভ্যালু গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য থাকবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এআই কাজ করবে এক্সিকিউশনে, আর মানুষ নেতৃত্ব দেবে ইনটেনশন ও ডিরেকশনে।

ভবিষ্যতে মাল্টিমোডাল বা আরও উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা এবং ঝুঁকি কী হতে পারে?

ভবিষ্যতে মাল্টিমোডাল বা আরও উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে বেশকিছু বড় সুবিধা দেখা যাবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এআই একসঙ্গে টেক্সট, ইমেজ, ভিডিও ও অডিও বুঝে এন্ড-টু-এন্ড প্রোডাকশন করতে পারবে। আইডিয়া থেকে শুরু করে ফাইনাল কনটেন্ট পর্যন্ত সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এর ফলে ছোট টিম বা একক ক্রিয়েটররাও স্টুডিও-কোয়ালিটির কনটেন্ট তৈরি করতে সক্ষম হবে। তবে এ সুবিধার পাশাপাশি কিছু গুরুতর ঝুঁকিও রয়েছে। ডিপফেক ও মিসইনফরমেশনের পরিমাণ বাড়তে পারে, যা বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। কপিরাইট, আইডেন্টিটি মিসইউজ এবং কনসেন্ট ছাড়া কনটেন্ট ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো আরও জটিল আকার ধারণ করবে। পাশাপাশি, অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতার কারণে সব একইরকম কনটেন্ট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে, যা সামগ্রিকভাবে ক্রিয়েটিভিটিকে ডাইলিউট করতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো কপিরাইট মেইনটেইন করার বিষয়টি। কনটেন্টের মালিকানা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে যাচ্ছে, এবং কপিরাইট রক্ষা করতে না পারলে ইন্ডাস্ট্রিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

কনটেন্টের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, এবং প্রাইভেসি নিয়ে নতুন কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে? এবং কীভাবে এ সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব?

কনটেন্ট তৈরিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও প্রাইভেসি নিয়ে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে। প্রথমত, ডিসক্লোজারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোন কনটেন্ট এআই দিয়ে তৈরি বা এআই-সহায়তায় তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে কি না। দ্বিতীয়ত, কনসেন্টের প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে; কারো মুখ, ভয়েস বা স্টাইল অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হলে তা ব্যক্তিগত অধিকার ও আইডেন্টিটি মিসইউজের ঝুঁকি তৈরি করে। তৃতীয়ত, ডেটা প্রাইভেসি একটি গুরুতর উদ্বেগের জায়গা, যেখানে ব্যক্তিগত ছবি, চ্যাট বা ডকুমেন্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে লিক হওয়া বা ট্রেনিং ডেটায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেখানে প্রাসঙ্গিক, সেখানে কনটেন্টে স্পষ্টভাবে ‘এআই-সহায়তাপ্রাপ্ত’ ডিসক্লোজার দেওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তির আইডেন্টিটি, মুখ বা কণ্ঠ ব্যবহার করা হলে অবশ্যই লিখিত কনসেন্ট বা রিলিজ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভেরিফায়েড সোর্স ব্যবহার, নিয়মিত ফ্যাক্ট-চেকিং এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক লেবেলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে, ক্রিয়েটরদের জন্য স্পষ্ট এআই এথিক্স গাইডলাইন এবং ডিজিটাল লিটারেসি ট্রেনিং চালু করা হলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।