তোফায়েল খান। ১৯৯৯-২০০০ মেয়াদে প্রথমবার বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির (বামুশিস) কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নেতৃত্বে আসেন। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সমিতির একাধিক শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিনা মূল্যের বই বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে বামুশিসের সাবেক এই চেয়ারম্যান তার ভাবনা বিনিময় করেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গেÑ
১৬ বছর ধরে বই বিতরণ হলেও পরিকল্পনামাফিক সমন্বতি কাঠামো গড়ে ওঠেনি, যে কাঠামোতে একটি সময়াবদ্ধ পরিকল্পনায় বই বিতরণ প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হবে।
নিঃসন্দেহে এটি লাইন-আপ করা যায়। বিভিন্ন সময়ে চেয়ারম্যানদের উদ্যোগও দেখেছি। তবে একটি শক্তিশালী-বিত্তশালী চক্র এটি তছনছ করে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। এনসিটিবি আমাদের দিয়ে কাজ করায়। এনসিটিবি নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন এনসিটিবি যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে বেনিফিট পায় কেউ বা কারা। এনসিটিবি অনিয়ন্ত্রিত হয় কীভাবে, তাদের অভিভাবকেরা কি দেখেন না? দেখলে এটি অবশ্যই সম্ভব।
প্রতি বছরই বই ছাপার সময় সিন্ডিকেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ই-জিপি সিস্টেমে এটি সম্ভব কীভাবে?
সিন্ডিকেটের বিষয়টি নানাভাবে হয়। এবার (২০২৭ শিক্ষাবর্ষ) বই ছাপার যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তা যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যায় ৮০ শতাংশ প্যাকেজ বড় করা হয়েছে। এনসিটিবির বই ছাপানোর যে মাপকাঠি, তাতে ১৫-২০টি প্রেসের হাতে ৮০ শতাংশ কাজ চলে যাবে।
আর সিন্ডিকেট করতে হয়। ছাপা, কাগজ সব ওদের হাতে। ওরা কাজ বিলম্বিত করে। এর মধ্যে ডিসেম্বর চলে এলে এনসিটিবির বিবেচনায় দ্রুত বই ওঠানোর তাড়া থাকে। এসব নিয়ে অনেক রিপোর্ট ইনভেস্টিগেশন হয়েছে, কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। আমার একটি প্রস্তাব, এনসিটিবি ছোট্ট একটি ইনভেস্টিগেশন করুক, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এনসিটিবির মনিটরিং টিমের অফিসাররা প্রেস পরিদর্শন করে বলছেন যে, ওই প্রেস বই দিতে পারেনি। অথচ ওই প্রেস যখন চালান করে বিল নিচ্ছে, ওই বিলে দেখা যাচ্ছে প্রেসটি ৩১ ডিসেম্বরের আগে বই দিয়ে দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন, কোনটা সত্য? মনিটরিং টিমের সদস্য নাকি প্রেস? লট বিভাজনে ই-জিপির নির্দেশনাই মানা হচ্ছে বলছে এনসিটিবি
এটা একটা খুব বাজে কথা। আজকের যিনি শিক্ষামন্ত্রী, তিনি বিগত বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এনসিটিবির দায়িত্বে ছিলেন। ওনার সময় শুধু প্রাইমারির কাজটা ৬০০ থেকে ৭০০টি মেশিনে কাজ হতো। তখন সরকার কাগজ দিত একটা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে। একটি প্রেসের কাছে ৩০ থেকে ৫০ টন কাগজ থাকত। তখন তো একটি কাগজও চুরি হয়নি। তখন ইন্সপেকশন টিম ছিল না, তখন তো মন্ত্রী মহোদয় বই দিতে পেরেছেন। আজ এনসিটিবির মনিটিরিং টিম দেখছে, বিশেষজ্ঞরা কাগজ পরীক্ষা করছেন, ইন্সপেকশন টিম পরীক্ষা করছে, এত ব্যবস্থার পরও খারাপ বই যাচ্ছে কেন? সদিচ্ছার অভাবটা কোথায়? আজ বেশি প্রেস হলে মনিটরিংয়ে সমস্যা হবে, তখন কেন হয় নাই? আসলে এসব অজুহাত দিয়ে একটা গোষ্ঠী কাজটি কুক্ষিগত করছে। বিগত পনের বছর আওয়ামী লীগ সমমনার বাইরে যে লোকগুলো কাজ করতে পারে নাই, আজ আপনি প্যাকেজ বড় করে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট বড় করে দিয়েছেন। ওরা তো কাজই করতে পারেনি, অভিজ্ঞতা হবে কোথা থেকে? এই সরকার বলছে, এক কোটি কর্মসংস্থান দেবে, অথচ এবার যা হয়েছে, প্রায় ৪০টি প্রেস কাজ করতে পারবে না। ৮০ শতাংশ কাজ যারা পাবে, তারা মার্চে বই দেবে, ডিসেম্বরে চালান দেবে। বিষয়টি পরীক্ষিত।
অনেক প্রেসের বিরুদ্ধে কালোবাজারে বই বিক্রির অভিযোগ রয়েছে, আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
প্রেস মালিকেরা বই বিক্রি করেন না, উপজেলায় যে বইটা অতিরিক্ত যায়, সেই বই কিনে এনে সরবরাহ করে। স্কুলগুলো এমপিও পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখায়। এ বিষয়গুলো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা জানেন। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলোÑ এনসিটিবি মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করে প্রকৃত চাহিদার এক কোটি বই কমিয়েছে। গত বছর এনসিটিবি চেয়ারম্যানের উদ্যোগে প্রতি বইয়ের ফর্মায় প্রেসের নাম লেখা থাকায় এক কোটি বই কমে গেছে। একটা ছোট্ট উদ্যোগে কেমন কাজ হয়েছে দেখেন। এরকম অনেক স্কোপ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনও এসব বিষয় নিয়ে কয়েকবার তদন্ত করেছে, ফলাফল সম্পর্কে কিছু জানেন?
অভিযোগ থাকলেই তো হবে না। এর সঙ্গে সম্পর্কিত কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করে অভিযোগকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে এনসিটিবি। সেটা কতটা হয়েছে জানি না।
মানসম্পন্ন বই দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী
প্রথমত, এনসিটিবির নিজের একটা ল্যাবরেটরি থাকতে হবে। আমার প্রেসের কাগজ এনসিটিবিতে যাবে। আমার সামনে কাগজ পরীক্ষা হবে। খারাপ হলে আমাকে দায়িত্ব নিতে হবে। এভাবে বই ছাপা ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে কৌশলগতভাবে এনসিটিবিকে আরও পরিকল্পিত হতে হবে এবং পুরো বিষয়টিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে ডেভেলপ করতে হবে।
সাক্ষাৎকারে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রূপালী বাংলাদেশকেও ধন্যবাদ।

