ঢাকা শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

আবর্জনা থেকে সম্পদ দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা

সৈয়দ আলমাস কবীর
প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১২:০৭ পিএম
বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলমাস কবীর। ছবি- সংগৃহীত

ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির স্বর্ণযুগে এটা নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন একটি সমস্যা-ই-বর্জ্য বা ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য। অচল বা বাতিলকৃত হাজার হাজার স্মার্টফোন, কম্পিউটার, হোম অ্যাপ্লাইয়েন্স এবং অনান্য ডিজিয়াল ডিভাইস এবং এসবে ব্যবহৃত ব্যাটারি দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই বর্জ্য, যা কিনা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। এই নীরব সংকটের মোকাবিলা যদি এখনই না করা যায়, তাহলে হুমকির মুখে পড়বে আমাদের পারিপার্শিক অবস্থা এবং জৈবিক ইকোসিস্টেম। অথচ কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ই-বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার্য একটি সমৃদ্ধ টেকসই শিল্পে পরিণত করা সম্ভব।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে পয়ঃবর্জ্যসহ অন্যান্য জৈবিক বর্জ্যরে পরিমাণ বেশি হলেও বর্ধীয়মান ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ক্রমশঃই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  রাজধানী ঢাকাতে এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। এখানে প্রায় ৯০% বর্জ্যই সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ করা হয় অনানুষ্ঠিক খাতে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের দ্বারা। কোনোরকম সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম বা পরিবেশগত সুরক্ষা-ব্যবস্থা ছাড়াই এসব ছেলেমেয়েরা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস, ব্যাটারি ও অন্যান্য বিষাক্ত বর্জ্য সংগ্রহ করে থাকে এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তা’ বাছাই ও ভাঙার কাজে নিয়োজিত থাকে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন খুবই শিথিল। সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি বিষাক্ত খণিজ পদার্থ ক্রমাগত মাটিতে মিশে ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে এবং তা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করছে।

কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, ই-বর্জ্য যে শুধুই পরিবেশ দূষণকারী তা নয়, বিভিন্ন রকমের দামি ধাতু আহরণের একটা বড় সুযোগ এনে দিতে পারে এটি। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইসের মাদার বোর্ডে সোনা, রূপা, প্যালেডিয়াম, তামা ও অন্যান্য দুর্লভ ধাতু ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যথাযথ নিষ্কাশন পদ্ধতির মাধ্যমে এই দামি ধাতুগুলো পরিত্যক্ত ডিভাইসগুলো থেকে বের করে আনা সম্ভব। ১০ লাখ বাতিল স্মার্টফোন থেকে ২৪ কেজি সোনা, ২৫০ কেজি রূপা আর ৯ টন তামা নিষ্কাশন করা সম্ভব। সমষ্টিগতভাবে চিন্তা করলে এটা একটা অভাবনীয় পরিমাণ। বাংলাদেশে বছরে লাখ লাখ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য ডিজিটাল বা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ও অ্যাপ্লাইয়েন্স ফেলে দেওয়া হয়। এগুলোকে একটি সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে এসে যদি এগুলো থেকে দামি ধাতু নিষ্কাশন করা যায়, তাহলে যে শুধু অর্থসাশ্রয়ই হবে তা নয়, একটা নতুন শিল্প খাত দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

এর জন্য প্রয়োজন হবে সরকার-অনুমোদিত রিসাইক্লিং হাব যেখানে হাইড্রোমেটলার্জিকাল ও পাইরোমেটালার্জিকাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদে দামি ধাতুসমূহ নিষ্কাশন ও পুনরুদ্ধার করা যায়। বিভিন্ন স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘আরবান মাইনিং’ ভেঞ্চার শুরুর উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে, যার মাধ্যমে তারা ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও ধাতু পুনরুদ্ধারের ব্যবসা করবেন। এই দামি ধাতুগুলো পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচনের লক্ষ্যে কতিপয় অতিপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। এর জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১’-এর যথাযথ প্রতিপালন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেস্পন্সিবিলিটি আইন জারি করতে হবে, যাতে উৎপাদকগণ তাদের বিক্রীত ও ব্যবহৃত পণ্য ফিরিয়ে নিতে প্রণোদিত হয় এবং পুনর্ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। 

এ ছাড়া যেসব কোম্পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে, তাদের জন্য কর প্রণোদনা প্রদান করা হলে অন্যান্য কোম্পানিগুলোও উৎসাহিত হবে। তা ছাড়া পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব এবং নিরাপদ নিষ্কাশন পদ্ধতি সম্পর্কে দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু করলে অনেকেই এ ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ই-বর্জ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করলে ছোট বয়স থেকেই রিসাইল্কিং-এর প্রতি অভ্যেস ও আগ্রহ তৈরি হবে। আইওটি এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্যপ্রবাহ ট্র্যাক এবং সংগ্রহের রুটগুলো অপ্টিমাইজ করা যেতে পারে। ড্রপ-অফ পয়েন্টগুলো শনাক্ত করতে বা পিকআপের সময়সূচি নির্ধারণ করতে নাগরিকগণের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলে সিস্টেমের ব্যবহার আরও কার্যকরী হবে এবং পুনর্ব্যবহারের দক্ষতা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা যাবে।

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গবেষণা এবং পাইলট প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য সরকার, একাডেমিয়া এবং শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ব্যাকটেরিয়া-ভিত্তিক ধাতু পুনরুদ্ধারের মতো জৈবপ্রযুক্তিগত সমাধানগুলো নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি করবে। স্টার্টআপগুলোর জন্য ইনকিউবেটরের ও অনুদানের ব্যবস্থা করলে আরও নতুন নতুন সমাধান সামনে আসবে।

সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যথাযথ নীতিমালা প্রয়োগ করে এবং দামি ধাতু পুনরুদ্ধারে উদ্ভাবনী সমাধানে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে যেখানে বর্জ্য ফেলে দেওয়া হয় না, পুনর্ব্যবহার করা হয়।

লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ আইসিটি
অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)