ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইবাদত ও আল্লাহর দাসত্ব

মো. শরিফুল ইসলাম
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা, যিনি প্রতিটি বিষয় নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং আসমান ও জমিন এবং এই দুইয়ের মাঝে যা কিছু আছে, তার কোনো কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করেননি। নিখিল বিশ্বের এই সুবিশাল আবর্তন, গ্রহ-নক্ষত্রের নিয়মতান্ত্রিক গতিপথ এবং প্রকৃতির সুনিপুণ রূপরেখা মূলত এক পরম সত্যের সাক্ষ্য দেয়Ñ এই মহাবিশ্বের একজন একক নিয়ন্ত্রণকর্তা রয়েছেন। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক এবং তাঁর কোনো শরিক নেই; তাঁর সত্তায়, তাঁর গুণে এবং তাঁর ইবাদতে কোনো ক্ষেত্রেই কোনো অংশীদার নেই। পবিত্র কোরআনের অমোঘ ঘোষণা:

‘আসমান ও জমিনে এমন কেউ নেই, যে পরম দয়াময় আল্লাহর নিকট বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে না।’ আমরা আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নেতা, নবী এবং আমাদের অভিভাবক মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল, যাঁকে সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের প্রধান বা নেতা বানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা মেরাজের রাতে তাঁকে নিজের অত্যন্ত নিকটে নিয়ে গিয়ে ‘বান্দা’ হিসেবেই তাঁর পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ওপর।

মানব সৃষ্টির মূল উৎস ও ইবাদতের পরিধি

হে মানবসকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে মানুষকে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করেছেন। সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষের এই মর্যাদার পেছনে রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট ও মহান উদ্দেশ্য। আল্লাহ তায়ালা এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষকে কেবল খেলাধুলা বা অনর্থক জীবনযাপনের জন্য পাঠাননি। তিনি জিন ও মানবজাতিকে কেবল তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বা লক্ষ্য পূরণের জন্য তাদের সৃষ্টি করেননি। ঐশী বাণীতে এই পরম সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে:

‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে কোনো রিজিক চাই না এবং আমি এটাও চাই না যে তারা আমাকে আহার করাবে।’ অতএব, জিন ও মানুষের জন্য তাদের সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে অবধারিত বিধান হলো, তারা যেন কেবল তাদের খালিক বা সৃষ্টিকর্তারই ইবাদত করে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের সংজ্ঞা কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিক উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষের চব্বিশ ঘণ্টার পুরো জীবনই ইবাদতে রূপান্তরিত হতে পারে, যদি তার নিয়ত ও কর্মপন্থা আল্লাহর বিধানের অনুগামী হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পারিবারিক দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে সমাজ পরিচালনাÑ সবকিছুই যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, তবে তার প্রতিটি পদক্ষেপই আল্লাহর দাসত্ব বা ‘উবুদিয়াত’-এর অন্তর্ভুক্ত।

খাঁটি দাসত্বের স্বরূপ ও ইচ্ছার আত্মসমর্পণ

আল্লাহর প্রতি খাঁটি দাসত্বের দাবি হলো, মানুষের অবস্থা এমন হবে যেন তার সমস্ত ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা তার রবের হুকুমের অধীনস্থ হয়ে যায়, এবং সে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেভাবেই পথ চলে যেভাবে তার মালিক বা রব পছন্দ করেন এবং সন্তুষ্ট হন। সৃষ্টিকর্তার অনুগত বান্দাদের শান বা বৈশিষ্ট্য এমনই হয়ে থাকে। তারা নিজেদের খেয়ালখুশির দাসত্ব করে না, বরং আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজের অহমিকা ও আমিত্বকে বিলীন করে দেয়। এই প্রসঙ্গে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার মন-মানসিকতা ও ইচ্ছা আমি যা নিয়ে এসেছি (অর্থাৎ শরিয়ত) তার অনুগামী না হয়।’ প্রকৃত বান্দা তো সেই, যে নিজের ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, বরং নিজের সমস্ত বিষয়কে তাঁর মালিকের ওপর সঁপে দেয়। তার মালিক যে বিষয়ে অসন্তুষ্ট হন কিংবা যা অপছন্দ করেন, বান্দা কখনোই সেটার কাছেও যায় না। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে একজন প্রকৃত বান্দার সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত। মানুষ হিসেবে আমাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ, আমরা অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী লাভ-ক্ষতির মোহে অন্ধ হয়ে যাই। কিন্তু সর্বজ্ঞাত আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেন, তা-ই সর্বোত্তম। পবিত্র কুরআনের মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়: ‘হতে পারে কোনো একটি বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে কোনো একটি বিষয় তোমরা পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর।’ সত্যিকারের বান্দা তো কেবল তাঁর মালিকের আদেশগুলোকেই জীবনের পাথেয় বানায় এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকে। বান্দার ওপর তাঁর মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কোনো হুকুম বা কর্তৃত্ব খাটে না। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন: ‘তাদের কেবল এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন খাঁটি মনে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে এবং দ্বীনকে তাঁর জন্যই নিবেদিত রাখে।’

সুখ-দুঃখে অবিচলতা

মুমিনের জীবনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑ তার মানসিক ভারসাম্য। বান্দা তো সুখ ও দুঃখ, সচ্ছলতা ও অস্বচ্ছলতাÑ সর্বাবস্থায় কেবল তাঁর মালিকের সন্তুষ্টিই কামনা করে। সৃষ্টিকর্তার অনুগত বান্দাদের নীতি এমনই হয়, তারা সব ধরনের পরিস্থিতিতেই রবের দাসত্বে মশগুল থাকে। অনুকূল পরিবেশে তারা শুকরিয়া আদায় করে, আর প্রতিকূল পরিবেশে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে। পক্ষান্তরে, আল্লাহ তায়ালা ওইসব লোকের নিন্দা করেছেন যারা এর বিপরীত পথে চলে, যাদের ইবাদত কেবল স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে, যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কোনো কল্যাণের মুখোমুখি হয়, তবে তাতে প্রশান্তিলাভ করে আর যদি কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হয়, তবে সে তার পূর্বের কুফরির দিকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো।’ মানুষের এই সুবিধাবাদী মানসিকতার এক নিখুঁত চিত্র আল্লাহ তায়ালা অন্য একটি আয়াতে তুলে ধরেছেন:

‘যখন মানুষকে কোনো দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে কিংবা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। কিন্তু যখন আমি তার সেই কষ্ট দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে যেন তাকে কোনো কষ্ট স্পর্শ করার কারণে সে আমাকে কখনোই ডাকেনি!’

সুযোগসন্ধানী এই আচরণের তীব্র নিন্দা করে তিনি আরও বলেছেন:

‘যখন আমি মানুষকে কোনো নেয়ামত দান করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অহংকারে দূরে সরে যায়।’

একজন প্রকৃত মুমিনের জীবন এমন দোলাচলে দুলতে পারে না। তার দাসত্ব কোনো সাময়িক নেয়ামত পাওয়ার ওপর শর্তযুক্ত নয়। সংকটে ও সচ্ছলতায় উভয় অবস্থাই তার জন্য আল্লাহর পরীক্ষা, আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই তার জীবনের মূল লক্ষ্য।

কিতাবের আলোকবর্তিকা ও জীবনের পূর্ণতা

মানবজীবনের এই জটিল ও আঁকাবাঁকা পথে চলার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদের হাতড়ে বেড়াতে দেননি। তিনি আমাদের দিয়েছেন এক চিরন্তন গাইডবুক বা জীবনবিধান। বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

‘আমি আপনার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি যা প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, এবং এটি মুসলমানদের জন্য হিদায়াত, রহমত ও সুসংবাদস্বরূপ।’

এই ঐশী কিতাব বা পবিত্র কোরআনই মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের অন্ধকার দূর করার একমাত্র আলোকবর্তিকা। যখনই মানুষ এই কিতাবের নির্দেশনা থেকে দূরে সরে গেছে, তখনই সমাজে নেমে এসেছে বিপর্যয়, অবক্ষয় আর মানসিক অশান্তি। পক্ষান্তরে, এই কোরআনের ছায়াতলে এলেই মানুষের অন্তর খুঁজে পায় তার কাক্সিক্ষত প্রশান্তি। জীবনের সব ক্ষেত্রে ইবাদত ও আল্লাহর দাসত্ব প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই মানুষের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত হয়। দাসত্ব কেবল নামাজের সেজদায় বা রোজার উপবাসে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো জীবনটাকে আল্লাহর ইচ্ছার ফ্রেমে সাজানোর নামই হলো প্রকৃত ইসলাম। মহান আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের জন্য এই মহিমান্বিত কোরআনের মাধ্যমে বরকত দান করুন এবং এর আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ জিকিরের মাধ্যমে আমাদের উপকৃত করুন। আমি আমার এই বক্তব্য শেষ করছি এবং নিজের জন্য, আপনাদের জন্য ও সমস্ত মুসলমানের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারাও তাঁর কাছে ক্ষমা চান, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়াময়। আমিন।