গাজ্ওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়। তবে মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এগুলোর অধিকাংশই অত্যন্ত দুর্বল অথবা জাল। কেবল অল্প কিছু বর্ণনা আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে রয়েছে। যেমনÑ হজরত সাওবান (রাদি.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন, আমার উম্মাতের দু’টি দলকে আল্লাহ্ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তার একটি হচ্ছে যারা হিন্দুস্থানবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। আর একটি হচ্ছে যারা ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে থাকবে। (তথ্যসূত্র: নাসাঈ হা/৩১৭৫; সহীহাহ্ , হা/১৯৩৪; সহিহুল জামে‘ হা/৪০১২, সনদ সহিহ। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, যে তোমাদের মধ্যে তাঁকে (ঈসা.)-কে পাবে, আমার পক্ষ থেকে সালাম দিবে’। (তথ্যসূত্র: আলবানী , কিস্ সতুল মাসীহিদ দাজ্জাল , পৃঃ ১৪২)।
এভাবে মুসলমানগণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর বিজয় লাভ করেন। যা হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে গযনীর সুলতান মাহমুদ বিন সুবুকতিগীন ও তাঁর প্রতিনিধিদের হিন্দুস্তানের উপর ১৭ বার আক্রমণ করার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল।
হাফেয ইবনু কাছীর, যাহাবি ও ইবনুল আছীরসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ বলেন, সৌভাগ্যবান, প্রশংসিত, গযনীর সুলতান মাহমূদ বিন সুবুকতিগীন এবং গভর্নরেরা ৪০০ হিজরির দিকে হিন্দুস্তানবাসীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন। তিনি সেখানে যে অভিযান প্রেরণ করেন তা ছিল প্রসিদ্ধ ও প্রশংসিত। তিনি বিখ্যাত সোমনাথ মন্দিরের সকল মূর্তি ভেঙে চুরমার করে দেন এবং তথাকার যাবতীয় অলংকার, মণিমুক্তা, স্বর্ণ ও রৌপ্যগুলো বাজেয়াপ্ত করেন। তিনি সেখানে অগণিত সম্পদ লাভ করেন এবং নিরাপদে বিজয়ীবেশে দেশে ফিরে যান!
তথ্যসূত্র: আল বিদায়া ১৯/১১; আল-কামিল ফিত তা-রীখ ৭/৬০৭’ যাহাবি, তা-রীখুল ইসলাম ২৭/২৪৪।
৫) তারও পরে আব্বাসীয় যুগে ৬০২ হিজরিতে দিল্লি ও বাংলা বিজিত হয় এবং সারা ভারত বর্ষে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে।
আর এভাবেই পুরো ভারতের উপর মুসলমানদের কর্তৃত্ব চলে আসে এবং পরে মামলুক, খিলজী, তুঘলক, সাইয়্যেদ, লোদী এবং মুঘলেরা পুরো ভারতবর্ষ শাসন করে।
সুতরাং উপরোক্ত বর্ণনা থেকে ধরে নেওয়া যায় যে, হাদিসে বর্ণিত হিন্দুস্তানবাসীর সঙ্গে যে যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে, তা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।
এখন যদি ধরে নেওয়া হয় যে, ভারতবাসীর সঙ্গে যুদ্ধ হবে শেষ যামানায়, যেমনটি কোনো কোনো বিজ্ঞ আলেম মনে করেন।
তথ্যসূত্র: হামুদ তুওয়াইজেরী, ইত্তেহাফুল জামা‘আত ১/৩৬৬। এতেও কিন্তু নির্দিষ্ট সময় ও কোনো দলকে নির্দিষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ রাসুল সাধারণভাবে একটি দলের কথা বলেছেন।
গাজ্ওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে উপরিউক্ত আলোচনার পর এ কথা নিঃসন্দেহে স্পষ্ট হয়েছে যে, হাদিসে বর্ণিত গাজ্ওয়াতুল হিন্দ বা হিন্দুস্তানবাসীর সঙ্গে যুদ্ধ ইতোমধ্যে সংঘটিত হয়ে গেছে, যা অভিজ্ঞ আলেমগণের ব্যাখ্যায় সুপ্রমাণিত। তবুও যদি কারো মতে এই যুদ্ধ শেষ যামানায় হবে বলে ধরে নেওয়া হয়, তবুও এ কথা নিশ্চিত করার সুযোগ নেই যে, ঠিক কোন্ সময়ে এটি সংঘটিত হবে বা কার নেতৃত্বে হবে।
সুতরাং গাজ্ওয়াতুল হিন্দ নিয়ে কতিপয় (কওমিপন্থি) যুবসমাজের অতিশয়োক্তি, মাতামাতি কিংবা রঙিন স্বপ্ন দেখানো একেবারেই অর্থহীন কর্ম।
শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে জান্নাতের শর্টকাট রাস্তা খুঁজে পাওয়ার নামে একশ্রেণির মুসলিম যুবক উগ্রবাদ ও চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা খুবই ভয়ংকর।
এই চরমপন্থিদের কারণে মুসলিম উম্মাহ্ ভেতরে ও বাইরে থেকে চরম অনিরাপদ ও কোণঠাঁসা হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাপী নষ্ট হচ্ছে দাওয়াতের উর্বর সেক্ষেত্রসমূহ। ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতার বয়স ষাট বছর হলেও তারা আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র হতে ব্যর্থ হয়েছে। যার কুফলস্বরূপ ভারতের নিরীহ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি নির্যাতন, হত্যা-সন্ত্রাস, বড় বড় মসজিদগুলো ভেঙে ফেলার মতো গর্হিত, কু-কর্মে লিপ্ত রয়েছে!
তথাপি তাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করা অসম্ভব।
কারণÑ প্রথমত: সমর শক্তি-সামর্থ্যে আমরা চুনোপুঁটি সমতুল্য এবং দ্বিতীয় যে কোনো যুদ্ধ/জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারার পূর্বশর্ত হলোÑ সরকার প্রধানের অনুমতি।
রসূল বলেছেন:
ইন্নামাল ইমামু জুন্নাতু ইউ ক-তালু মিন ওয়ারা-ইহি।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধান/সরকারপ্রধান ঢাল, যাকে সামনে রেখে যুদ্ধ পরিচালিত হবে।
তথ্যসূত্র: বুখারি, আস-সহিহ ৩/১০৮০; মুসলিম, আস-সহিহ ৩/১৪৭১।
এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, সাহাবিগণ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাইরে যুদ্ধ বা কিতালে লিপ্ত হননি। গাজ্ওয়াতুল হিন্দ নিয়ে মোটা দাগে যে ভ্রান্তি সমাজে প্রচলিত আছে তা হলোÑ এই যুদ্ধে সবার অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
তাই তো সাম্প্রতিককালে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাকে তো এই মর্মে প্রশ্ন করেই বসলেন যে, মাওলানা ! এই যুদ্ধে আপনি কি যোগ দেবেন না?
অথচ শরিয়তের নিয়ম হলোÑ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা একটি ফরজে কেফায়া। তথা নির্দিষ্ট মুজাহিদ শ্রেণির একটি দল গাজ্ওয়াতুল হিন্দ-সহ কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যে কোনো যুদ্ধে গেলেই সবাই দায়মুক্ত হবেন।
তাই এহেন ক্রান্তিকালে ভারত-বাংলাদেশের মুসলমানদের উচিত হবে কাফির-মুশরিক গংএর ওপর আক্রমণাত্মক না হয়ে রক্ষণাত্মক অবস্থানে নিরাপদে থেকে শুধু আল্লাহর শেখানো দুআ করে যাওয়া:
রব্বানা লা তাজ্আল্ না ফিতনাতাল লিল মু’মিনীন, ওয়ানাজ্জিনা বিরহমাতিকা মিনাল কওমিল কাফিরীন।
হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে জালিম জাতির অত্যাচারের পাত্র কোরো না, আর তোমার অনুগ্রহে আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করো।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীনের নামে হৃদয়কে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হেফাযত করে কোরআন সহিহ সুন্নাহর অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন- (আমিন!) ১৬মে তারিখে প্রকাশের পর
লেখক : তাফসির-কারক, রমজানে সেহরি অনুষ্ঠান পরিচালনা-সহ ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভাষ্যকার : বাংলাদেশ বেতারে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্বারি।

