ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬

দেনমোহর : ইসলাম বনাম সমাজ

সাকিবুস সাইয়িদ সাকিব
প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র চুক্তি, আর দেনমোহর (মাহর) সেই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেনমোহর হলো স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত একটি আর্থিক উপহার, যা ইসলাম নারীর সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি কোনো দয়া, অনুগ্রহ বা দান নয়; বরং স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘আর তোমরা নারীদের তাদের মোহর আনন্দের সঙ্গে প্রদান কর।’ (সুরা আন-নিসা ৪:৪)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দেনমোহর নারীর অধিকার এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করা স্বামীর দায়িত্ব। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরিÑ দেনমোহর কোনো নারীর মূল্য নয় এবং এটি স্ত্রীকে ‘কিনে নেওয়ার’ মাধ্যমও নয়। ইসলাম মানুষকে পণ্য হিসেবে দেখে না। বরং দেনমোহর হলো বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে স্ত্রীকে সম্মানিত করার একটি ব্যবস্থা এবং তার আর্থিক অধিকারের স্বীকৃতি।

ইসলামে মূলনীতি হলো, দেনমোহর স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং তা পরিশোধ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেনÑ ‘সর্বোত্তম বিবাহ হলোÑ সেই বিবাহ, যা সবচেয়ে সহজ ও কম ব্যয়বহুল।’ (মুসনাদ আহমদ)। আরেক হাদিসে এসেছে : ‘সেই নারী সবচেয়ে বরকতময়, যার মোহর সবচেয়ে সহজ।’ (মুসনাদ আহমদ)। ইসলামে দেনমোহরের জন্য বিশাল অঙ্ক নির্ধারণ করা আবশ্যক নয়। এমনকি রাসুল (সা.) এক সাহাবীর বিবাহ লোহার একটি আংটির বিনিময়েও সম্পন্ন করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামে দেনমোহরের পরিমাণের চেয়ে তা প্রদান করার আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরের প্রকৃত উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন, লোক দেখানো বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার অজুহাতে অত্যধিক পরিমাণ দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। এমনকি পাত্রের সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়, যা বাস্তবে পরিশোধের কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। ফলে দেনমোহর অনেক সময় কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বিয়ের সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ লেখা হলেও তা পরিশোধ করা হয় না। বরং প্রায় পুরো দেনমোহর বাকি রেখে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে স্ত্রীর কাছ থেকে তা মাফ চেয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে দেনমোহর একটি প্রকৃত দায় এবং ঋণ, যা পরিশোধ করা স্বামীর ওপর আবশ্যক। রাসুল (সা.) বলেছেনÑ ‘যে ব্যক্তি মোহর আদায়ের নিয়তে বিবাহ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেন। আর যে প্রতারণার উদ্দেশ্যে তা গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (সহিহ আল-বুখারি)। অনেকেই মনে করেন, দেনমোহর বাকি রাখলে তেমন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি ঋণ, যা মানুষের হকের অন্তর্ভুক্ত। মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের পূর্বে এই দেনা পরিশোধ করা আবশ্যক। আরও একটি সামাজিক ধারণা হলোÑ বেশি দেনমোহর নির্ধারণ করলে বিবাহবিচ্ছেদ হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্পর্ক টিকে থাকে তাকওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার মাধ্যমে; কাগজে লেখা বিশাল অঙ্কের মাধ্যমে নয়। ইসলাম চরিত্র, তাকওয়া ও শালীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। নারী হোক বা পুরুষÑ উভয়ের জন্যই পবিত্রতা ও আত্মসংযম অপরিহার্য। তাই কারো অতীত বা ব্যক্তিগত পাপের বিচার করার দায়িত্ব মানুষের নয়; চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র আল্লাহ। তবে এটুকু সত্য যে, একজন মুসলিম নারী ও পুরুষ উভয়েরই উচিত ইসলামের বিধান মেনে চলা এবং নিজেদের চরিত্রকে সুন্দর রাখা। দেনমোহরের উদ্দেশ্য কখনোই পাত্রপক্ষকে চাপ দেওয়া নয়, আবার এটিকে অবহেলা করাও নয়। বরং এমন পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত, যা স্বামীর জন্য বাস্তবসম্মত এবং স্ত্রীর জন্য সম্মানজনক। এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, দেনমোহর শুধু দুনিয়ার দায় নয়; এটি আখিরাতের জবাবদিহির বিষয়ও। রাসুল (সা.) বলেছেনÑ শহিদ ব্যক্তির সকল গুনাহ ক্ষমা করা হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না।’ (সহিহ মুসলিম)। যেহেতু দেনমোহর একটি ঋণ, তাই এটি পরিশোধ না করে অবহেলা করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কিয়ামতের দিন মানুষের হকের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

সুতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম পদ্ধতি হলো-

১. দেনমোহর স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা। ২. তা পরিশোধ করার আন্তরিক নিয়ত রাখা। ৩. লোক দেখানো বা অহংকারের জন্য অতিরিক্ত অঙ্ক নির্ধারণ না করা। ৪. দেনমোহরকে বিবাহবিচ্ছেদ প্রতিরোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করা। ৫. নারী ও পুরুষ উভয়ের চরিত্র, তাকওয়া ও দ্বীনদারিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। ইসলাম দেনমোহরকে নারীর সম্মান ও অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে; কিন্তু সমাজের অনেক স্থানে তা লোকদেখানো অঙ্ক, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং অবাস্তব প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষায় ফিরে গেলে দেনমোহর আবার তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পাবে।

লেখক : ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)