মোবাইল ফোনে একটি জনপ্রিয় অনলাইন গেম চলছে। খেলোয়াড়ের সামনে নতুন একটি চরিত্র, আকর্ষণীয় পোশাক কিংবা শক্তিশালী অস্ত্র পাওয়ার সুযোগ। কিন্তু সেগুলো পেতে বাস্তব অর্থ ব্যয় করতে হবে। কখনো নির্দিষ্ট মূল্য দিয়ে জিনিস কেনা যায়, আবার কখনো টাকা দিয়ে খুলতে হয় একটি রহস্যময় বাক্স। সেই বাক্সে কাক্সিক্ষত পুরস্কার থাকবে কি না, তা পুরোপুরি ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। না পেলে আবার টাকা খরচ। এভাবেই অনেক কিশোর-তরুণ অজান্তেই এমন এক অর্থনৈতিক চক্রে জড়িয়ে পড়ছে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে গভীরভাবে ভাবনার বিষয়।
বর্তমানে পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ই-ফুটবল, ফিফাসহ অসংখ্য অনলাইন গেমে এই ধরনের ইন-গেম পারচেজ বা গেমের ভেতরের কেনাকাটার ব্যবস্থা রয়েছে। গেমগুলো প্রথমে বিনামূল্যে খেলতে দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে খেলোয়াড়কে এমন অবস্থায় নেওয়া হয়, যেখানে খরচ না করলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি তৈরি হয়।
লুট বক্স : বিনোদনের আড়ালে ভাগ্যের খেলা
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো ‘লুট বক্স’ বা ‘মিস্ট্রি বক্স’। এখানে খেলোয়াড় অর্থ দিয়ে একটি ভার্চুয়াল বাক্স কেনে, কিন্তু ভেতরে কী থাকবে তা আগে থেকে জানা যায় না। কাক্সিক্ষত জিনিস পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফলে একই জিনিসের আশায় একজন খেলোয়াড় বারবার অর্থ ব্যয় করতে পারে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের লেনদেনে বড় প্রশ্ন হলোÑ এখানে কি প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে, নাকি অনিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে? শরিয়তে এমন লেনদেনকে ‘গারার’ বা অতিরিক্ত অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনিশ্চয়তাপূর্ণ কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫১৩)
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পদ্ধতির সঙ্গে ক্যাসিনোর স্লট মেশিনের কার্যপ্রণালির উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। অনিশ্চিত পুরস্কারের প্রত্যাশা মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা ধীরে ধীরে আসক্তির ঝুঁকি তৈরি করে। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ যেন এমন পথে না যায় যেখানে লোভ, আসক্তি ও অপচয় তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এ কারণেই বিশ্বের কয়েকটি দেশ, যেমন বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস, নির্দিষ্ট ধরনের লুট বক্সকে জুয়ার আওতায় এনে নিষিদ্ধ করেছে।
কেন উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা?
কিশোরদের মস্তিষ্ক এখনো বিকাশমান। তাই তাৎক্ষণিক আনন্দ, পুরস্কার পাওয়ার আকাক্সক্ষা এবং প্রতিযোগিতার চাপ তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলে। গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নানা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে খেলোয়াড়কে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রাখতে এবং ধীরে ধীরে অর্থ ব্যয়ে উৎসাহিত করে।
ইসলাম মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে সংযত রাখতে শিক্ষা দেয়। কোরআন ও হাদিসে বারবার বলা হয়েছে, মানুষ যেন নিজের সম্পদ, সময় ও শক্তিকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করে। অথচ অনেক পরিবারে দেখা যায়, সন্তান অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং, ব্যাংক কার্ড বা ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে অর্থ ব্যয় করছে। কোথাও কোথাও এই আসক্তি পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক ক্ষতি এমনকি অপরাধের কারণও হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি শুধু আর্থিক সমস্যা নয়; বরং নৈতিক ও আত্মিক ক্ষতিরও কারণ।
ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি : ইসলাম বৈধ বিনোদনকে নিষিদ্ধ করেনি। তবে সময়, সম্পদ ও অর্থের সঠিক ব্যবহারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে সফল মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, তারা অনর্থক ও অকল্যাণকর কাজ থেকে বিরত থাকে। (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতি-গ্রস্তÍসুস্থতা ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২) । অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৭) ।
ভার্চুয়াল কোনো পোশাক, অস্ত্র বা অলংকারের জন্য বাস্তব অর্থ ব্যয় করা যদি সীমিত, সচেতন এবং প্রয়োজনসাপেক্ষ হয়, তবে তা ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয়, আসক্তিমূলক ও সীমাহীন ব্যয় নিঃসন্দেহে ইসলামের সংযম, মিতব্যয়িতা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন মুসলিমের উচিত নিজের সম্পদকে এমন কাজে ব্যয় করা, যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ থাকে।
লুট বক্স কি জুয়ার পর্যায়ে পড়ে?
ইসলামে জুয়া (মাইসির) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেন বা ‘গারার’ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কোরআনে জুয়াকে শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে এবং তা থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৯০-৯১)।
লুট বক্সের ক্ষেত্রে অর্থ প্রদান করা হলেও কী পাওয়া যাবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এ কারণে সমকালীন বহু ইসলামি গবেষক ও ফিকহবিদ এই ব্যবস্থাকে জুয়া বা গারারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন। যদিও সব আলেমের মত এক নয়, তবে অধিকাংশই এটিকে অন্তত সন্দেহজনক এবং পরিহারযোগ্য বলে মনে করেন। ইসলামের মূলনীতি হলোÑ সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা উত্তম, বিশেষ করে যখন তা অর্থ, আসক্তি ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অভিভাবকদের করণীয় : শুধু গেম নিষিদ্ধ করাই সমাধান নয়। বরং সন্তান কোন গেম খেলছে, সেখানে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ আছে কি না, কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং যুক্ত রয়েছে কি নাÑ এসব বিষয়ে সচেতন নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে সন্তানকে অর্থের মূল্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ, হালাল-হারামের পার্থক্য এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম পরিবারকে দায়িত্বশীলতার কেন্দ্র হিসেবে দেখে। তাই অভিভাবকের কর্তব্য শুধু খাবার, পোশাক ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করা নয়; বরং সন্তানের চরিত্র, অভ্যাস ও ব্যয়ের দিকেও নজর রাখা। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে, প্রতিটি অর্থ ব্যয় আল্লাহর সামনে জবাবদিহির বিষয়।
সচেতনতার বিকল্প নেই : অনলাইন গেম নিজেই সবসময় ক্ষতিকর নয়। অনেক গেম বিনোদন, কৌশলগত চিন্তা ও দলগত কাজের দক্ষতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে। তবে যখন গেমের ভেতরে অর্থ ব্যয়ের কাঠামো ভাগ্যনির্ভর হয়ে যায় এবং খেলোয়াড়কে বারবার টাকা খরচে প্রলুব্ধ করে, তখন তা শুধু বিনোদনের বিষয় থাকে না; বরং নৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রশ্নের জন্ম দেয়। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ যেন এমন কাজ থেকে দূরে থাকে যা তাকে গুনাহ, অপচয় বা আসক্তির দিকে নিয়ে যায়। প্রতিটি ব্যয়ের আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারেÑ এই অর্থ কি সত্যিই প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় হচ্ছে, নাকি কেবল ক্ষণিকের ভার্চুয়াল আনন্দের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে? এই আত্মসমালোচনাই হতে পারে একজন মুসলিমের সচেতন ডিজিটাল জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।

